চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের সময় খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ার পর সামনে এসেছে ফলাফল কারসাজির অভিযোগ।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, একটি বিষয়ে খাতায় শূন্য থাকলেও প্রকাশিত ফলাফলে ওই বিষয়ে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি শুধু একটি বিষয় নয়, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা তিনটি বিষয়ের খাতাতেই নম্বরের অমিল পাওয়া যায়।
পরে ওই শিক্ষার্থীর অন্যান্য বিষয়ের উত্তরপত্রও যাচাই করা হলে সেখানেও খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের পার্থক্য শনাক্ত হয়। গত ২৫ আগস্ট এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চমাধ্যমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ দিদারুল আলম এবং সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল আজিজ।
তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও তদন্তের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এবার এসএসসিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী।
বোর্ড সূত্রে জানা যায়, নগরের একটি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সময় খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ে। পুনর্নিরীক্ষণের সময় একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে বিষয়টি শনাক্ত করেন। খাতায় নম্বর ছিল শূন্য, অথচ প্রকাশিত ফলাফলে ওই অংশে ৪৫ নম্বর দেখানো হয়। পরে বিষয়টি যাচাই করে কম্পিউটার সেন্টারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গেও উত্তরপত্রের নম্বরের অমিল পাওয়া যায়।
ওই শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়—এই তিন বিষয়ের পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছিল। তিনটি বিষয়েই খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের পার্থক্য শনাক্ত হয়। বোর্ড সূত্র জানায়, তিনটি বিষয়ের উত্তরপত্রে অমিল পাওয়ার পর শিক্ষার্থীর অন্যান্য বিষয়ের খাতাও তলব করে যাচাই করা হয়। সেগুলোতেও খাতায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। পরে ঘটনা অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলও সংগ্রহ করেছে কমিটি। বোর্ড সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ কপি বোর্ডে জমা দেয়।
এ বিষয়ে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্যও প্রতিবেদন প্রকাশ করার আগে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে তদন্ত কমিটির প্রধান ও বোর্ডের সচিব জানিয়েছেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে’। তবে বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তরের অপেক্ষায় আছে।
বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষার হল থেকে উত্তরপত্রের প্রথম অংশ আগেই কম্পিউটার সেন্টারে পাঠানো হয়। সেগুলো স্ক্যান করে আগেই সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে প্রধান পরীক্ষকদের কাছ থেকে নম্বর পাওয়ার পর সেগুলো স্ক্যান করে সার্ভারে যুক্ত করা হয়। ফলাফল প্রকাশের কয়েক দিন আগে নম্বর মিলিয়ে শিক্ষার্থীর ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। এ পর্যায়েই শিক্ষার্থীর পরিচয় জানা সম্ভব হয়। এরপরই নম্বর পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে।
বোর্ডের তিন কর্মকর্তা বলেন, আগের জালিয়াতিগুলোতে কম্পিউটার শাখা এবং পরীক্ষা শাখার একটি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। এবারও কম্পিউটার শাখার বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জমা হয়নি। সুতরাং বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না এখনই। বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করা বারণ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তাধীন বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা যাবে না। আমাদের তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
এসময় তদন্ত প্রতিবেদন আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেব। এরপর বিস্তারিত জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।