হু হু করে বাড়ছে তিন নদীর পানি, তলিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম

উজান থেকে আসা ঢলে পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে তিনটি ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পদ্মার পাশাপাশি মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতেও পানি বাড়ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৬ মিটার। নদীর বিপদসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। 

শিবগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অন্তত আড়াই হা পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদ্রাসায় পানি ঢুকে পড়েছে। তলিয়ে যাচ্ছে আমন ধানের জমি। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় পরিবার নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্যানিটেশন সংকট।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে ৪৪ সেন্টিমিটার। ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ছিল ২১ দশমিক ৩২ মিটার। ৮ সেপ্টেম্বর ২১ দশমিক ৪৪ মিটার, ৯ সেপ্টেম্বর ২১ দশমিক ৫৮ মিটার, ১০ সেপ্টেম্বর ২১ দশমিক ৬৯ মিটার এবং সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৭৬ মিটারে।

পদ্মার পাশাপাশি মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতেও পানি বাড়ছে।

শুক্রবার সকাল ৯টায় মহানন্দা নদীর খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার। এ নদীর বিপদসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবা নদীর রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪৬ মিটারে। এ নদীর বিপদসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার। পদ্মার পানি বাড়ায় নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে।

পাঁকা ইউনিয়নের বিশরশিয়া গ্রামের লালমোহাম্মদ বলেন,

‘উপরের বৃষ্টি, নীচে ভাঙন ও অন্যদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চারদিক। পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। কোনো কূল কিনারা পাচ্ছি না।’

গমের চর এলাকার তরিকুল আলম বলেন, ভাঙনের কবলে সামান্য কিছুদিন আগে বাড়ি ঘর নিয়ে দশরশিয়া গ্রামে অস্থায়ীভাবে বাড়ি করেছি। তাও আবার কয়দিন থেকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

আব্দুল হামিদ বলেন, পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি। দ্রুত বিশুদ্ধ পানি ও ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন।

আরিফুর রহমান বলেন, পানির কারণে চলাচল ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

অন্যদিকে দূর্লভপুর গাইপাড়া, নামো জগনাথপুর, নামো পিয়ালীমারী, হাসানপুর ও মনাকষা ইউনিয়নের চর সিংনগর, হঠাৎপাড়া, পারচৌকা নতুনপাড়া, নতুন রাঘরবাটিসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পানিবন্দী পরিবারগুলোর তালিকা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত  মানুষের জন্য দ্রুত ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামীকাল পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়তে পারে। এরপর পানি কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।