রাজশাহীতে আঠারোর আগেই ৬৭ শতাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে!

রাজশাহী অঞ্চলে ১৮ বছরের আগেই ৬৭ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ইউনিসেফ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ তথ্য বলছে, ‘এ হার শহরে প্রায় ৫০ ভাগ, গ্রামে প্রায় ৫৬ ভাগ। এছাড়া ১৫ বছরের আগেই বিয়ে হচ্ছে প্রায় ১৩ ভাগ শিশুর। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, টানা দুই বছর ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে চলছে নেতৃত্ব শূন্যতা। উপরন্তু এনজিওগুলোর বরাদ্দ কমায় সচেতনতা কর্মসূচিতে ভাটা পড়েছে। ফলে সরকারি দপ্তরের নামমাত্র কমিটি বাল্যবিবাহ থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাল্যবিবাহ সম্পর্কে পরিসংখ্যান ব্যুরো আরো বলেছে, ‘রাজশাহী অঞ্চলে ১০ থেকে ১৯ বছরে ৬৫ দশমিক ০৭ ভাগ ছেলেমেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এদের ৭ দশমিক ১২ ভাগের বয়স ১০ থেকে ১৪ বছর।’

রাজশাহীর চর এলাকার পরিস্থিতি আরো করুণ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের অভাবে চরের ৯৫ ভাগ মেয়ে শিশু প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতেই বিয়ে দেওয়া ‘নিরাপদ’ মনে করেন অভিভাবকেরা। সেখানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ তেমন চোখে পড়ে না। শহরের দায়সারা সভা-সেমিনার কোনো কাজে আসে না। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হলেও প্রতিষ্ঠানের অভাবে তারা শিক্ষার স্বপ্ন হারাচ্ছে।

এ বিষয়ে চর নবীনগর প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক এমদাদুল হক বলেন,‌‘অভিভাবকেরা তাদের মেয়েদের বিয়ে দেন। কারণ এসএসসি লেভেলের স্কুল এবং এইচএসসি পর্যায়ের কলেজ নাই। দুর্গম চরের পথ ও নদী পেরিয়ে এসব মেয়েদের শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষার সামর্থ্য ও নিরাপত্তা নেই।’  ব্লাস্ট রাজশাহীর সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সামিনা বেগম জানান, ‘পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের তথ্যের চেয়ে বাল্যবিবাহের প্রকৃত সংখ্যা বেশি। এসব বিয়ের কারণে বিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহও বেশি। অথচ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, সচেতনতা ও আইন প্রয়োগে জেলা, উপজেলা, স্থানীয় সরকারসহ ১০টির সরকারি কমিটির সঙ্গে অনেক বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে।’

পবা উপজেলার দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির পরিচালক ও বিভাগীয় জয়ীতা রহিমা বেগম বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আগের মতো প্রচারণা নেই। অন্যদিকে, পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া এবং দর্শনপাড়াসহ কয়েকটি ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেম্বার (সদস্য) বলেন, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রকল্প ও বাজেট স্বল্পতায় প্রচারণায় গতি কমেছে। হুজরিপাড়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উঠান বৈঠকেরও তো খরচ আছে, কিন্তু বাজেট নেই। এগুলো নিজের অর্থায়নে যতটুকু পারি ততটুকু করি।’ দর্শনপাড়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী বলেন, ‘আমরা বাল্যবিবাহের খবর পেলে বন্ধের চেষ্টা করি। নিজেরা বন্ধ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত ইউএনওকে খবর দেই।’

রাজশাহী ইইউডিএস আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক তাসবীর আহমদ খান বলেন, ‘বাল্যবিবাহ বিভিন্ন প্রকল্পের একটা কম্পোনেন্টের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হয়। ঐ প্রকল্প এবং ডোনার ফান্ডিং কমেছে। ফলে উঠান বৈঠকও কমেছে।’ ‘লফস’ রাজশাহীর ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দিন দিন কর্মসূচি ছোট হচ্ছে। উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল বলেন, ‘আর্থিক সংস্থানের অভাবে অনেকগুলো এনজিও ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। যেগুলো সীমিত হয়েছে, তারাও হয়তো বাল্যবিবাহের ইস্যুটা বাদ দিচ্ছেন।’