ইয়াবা পাচারের গোপন পথ ‘শিশুর পেট’

খেলার বয়স তাদের। স্কুলে যাওয়ার কথা, মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা। অথচ সেই বয়সেই মাদক কারবারিদের কাছে তারা হয়ে উঠেছে ইয়াবার ‘বাহক’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এবার ‘শিশুর পেট’ কে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক পাচারের গোপন পথ হিসেবে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৯ ও ১২ বছর বয়সি দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে উদ্ধার হয়েছে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচারের কাজে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে র্যাব। এর আগেও একই পন্থায় দুই শিশুকে ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করা হয়েছিল।

পেটে ১৩৩ প্যাকেট : চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশির সময় বিষয়টি সামনে আসে। এক নারীসহ দুই শিশুকে আটক করার পর সন্দেহ হওয়ায় তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক্স-রে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, শিশু দুটির পাকস্থলীতে রয়েছে একের পর এক প্যাকেট। চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে সেগুলো বের করার পর পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে মোট ১৩৩টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৯ বছর বয়সি শিশুটির পেট থেকে ৬৭টি এবং ১২ বছর বয়সি শিশুটির পেট থেকে ৬৬টি প্যাকেট। সব মিলিয়ে এসব প্যাকেটে ছিল ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, শিশুদের সঙ্গে একজন নারীকে রাখার উদ্দেশ্য ছিল সন্দেহ এড়ানো। পরিবার নিয়ে যাত্রা করছে—এমন একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেই চালানটি পার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

৮ হাজার টাকার প্রলোভন : র্যাবের দাবি, অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে শিশু দুটিকে মাদক পরিবহনে রাজি করানো হয়েছিল। তাদের মাসে ৮ হাজার টাকা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের বাজার খরচ বহনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। দরিদ্র পরিবারের আর্থিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এর আগেও দুই শিশুকে দুই বার ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; শিশুদের নিয়মিত বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

কারবারিদের নতুন কৌশল : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, শিশুদের পাকস্থলী ব্যবহার করে মাদক পরিবহন মাদক কারবারিদের নতুন কৌশল। তিনি জানান, এ পর্যন্ত পাকস্থলিতে ইয়াবার চালান আটকের যেসব ঘটনা তিনি দেখেছেন, তার সিংহভাগই ছিল নারী। বিভিন্ন বয়সি এসব নারী একেকটি চালানে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত ইয়াবা বহন করেছেন। শিশুরা এখনো সেভাবে টার্গেটের বাইরে থাকলেও সব বিষয় মাথায় রেখেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ঢাকায়ও ধরা পড়েছিল পেটে ইয়াবা : শিশু-কিশোরদের পাকস্থলী ব্যবহার করে ইয়াবা পরিবহনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবা এনে সরবরাহের সময় ১৩ ও ১৪ বছর বয়সি দুই কিশোরকে আটক করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের পেট থেকে ইয়াবা উদ্ধারের পাশাপাশি তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকেও ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য তখন প্রকাশ পায়।

এর আগে রাজধানীতেও পাকস্থলীতে ইয়াবা বহনের একাধিক ঘটনা ধরা পড়ে। অর্থাত্ পাচারকারীদের কৌশল বদলালেও শিশু-কিশোরদের মাদক পরিবহনে ব্যবহারের প্রবণতা নতুন নয়।

প্যাকেট ছিঁড়লেই মৃত্যুঝুঁকি : পেটের ভেতর ইয়াবার প্যাকেট বহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মেহেদী হাসান জানান, কোনো প্যাকেট পাকস্থলীতে ছিঁড়ে গেলে মাদকের উপাদান দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে মারাত্মক বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। অর্থের বিনিময়ে শিশুদের এমন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া তাই শুধু মাদক অপরাধ নয়, তাদের জীবন নিয়েও ভয়ংকর খেলা।