প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী, মৃত্যুও থেমে নেই। অথচ এ সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওষুধ ধার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মশক নিধন কার্যক্রম চলছে।
এমনকি নিজেদের মশার ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি থাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছ থেকে ১৬ হাজার লিটার মেলাথিয়ন কীটনাশক ধার নিয়েছে সংস্থাটি। গত ১ সেপ্টেম্বর উত্তর সিটির কাছ থেকে ওই কীটনাশক নিয়ে যায় দক্ষিণ সিটি।
তবে দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন আর তাদের ওষুধের সংকট নেই। মশা নিধনের জন্য নির্ধারিত কীটনাশক তারা হাতে পেয়েছেন। গত মঙ্গলবার থেকে নিজেদের কেনা কীটনাশক ব্যবহার করেই মশা নিধনের কাজ চালাচ্ছেন তারা। একইসঙ্গে উত্তর সিটির কাছ থেকে ধার নেওয়া কীটনাশক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
জানা গেছে, এতদিন ডিএসসিসি উড়ন্ত মশা মারার জন্য ডেলটামেথ্রিন নামের ওষুধ ব্যবহার করে আসছিল। এই ওষুধ মশা নিয়ন্ত্রণে এখন ঠিকমতো কার্যকর না থাকায় ডিএনসিসি কয়েক বছর ধরে ভারত থেকে আমদানি করা ম্যালাথিয়ন ওষুধ ব্যবহার করে আসছে। তবে গত বছর জাপানের গবেষকরা দেখতে পান ডেলটামেথ্রিনের কার্যকারিতা ঢাকার মশার ক্ষেত্রে অনেকটা কমেছে। তখন ডিএসসিসি ডেলটামেথ্রিনের বদলে ম্যালাথিয়ন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানকে ম্যালাথিয়ন সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাদের সরবরাহ করা ওষুধের নমুনা পরীক্ষাগারে উত্তীর্ণ হয়নি। পরে তারা ডিএনসিসির দ্বারস্থ হয়। ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ ২৭০ লিটার ম্যালিথিয়ন ওষুধ ধার হিসেবে চায় ডিএনসিসির কাছে। গত মাসে ডিএনসিসি ৮০ লিটার ম্যালাথিয়ন দেয়। সেটি দিয়ে চলছে ডিএসসিসির মশক নিধন কার্যক্রম। ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’
অবশ্য এ বিষয়টি এড়িয়ে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহান ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, ‘এখন আমরা ডেলটামেথ্রিনই আপাতত ব্যবহার করব। আমাদের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার আছে। আরও সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি শুরু করা হবে। আগামী রোববার মুগদা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে।’
এছাড়া ডিএসসিসি এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে আছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগে, গত ২৪ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খয়বর রহমান ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দেন। চিঠিতে দক্ষিণ সিটির জন্য ৭০ হাজার লিটার পরিপক্ব মশা নিধনের কীটনাশক (অ্যাডাল্টিসাইড) ধার দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
এতে বলা হয়, মশা নিধনের কাজে ব্যবহারের জন্য ঠিকাদারদের সরবরাহ করা ২ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ডেলটামেথ্রিন কীটনাশক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মেলাথিয়ন সরবরাহের জন্যও আলাদা কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগায় মশা নিধনের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য উত্তর সিটির কাছ থেকে কীটনাশক ধার চাওয়া হয়।
দক্ষিণ সিটির সিইও খয়বর রহমান বলেন, সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া মশার ওষুধ দিতে ঠিকাদার দেরি করেছিলেন। পরে ওই ওষুধ পরীক্ষার জন্য পাঠাতেও দেরি হয়। পরীক্ষার ফল পেতেও সময় লেগেছে। তবে এখন পরীক্ষার ফল পাওয়া গেছে। এখন আর ওষুধের কোনো সংকট নেই। গত মঙ্গলবার নিজেদের কেনা কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ সিটির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ১৬ হাজার লিটার মেলাথিয়ন কীটনাশক দেওয়া হয়। গত ৩০ আগস্ট দক্ষিণ সিটির মনোনীত প্রতিনিধির কাছে ওই কীটনাশক বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দুই দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে যায়।
উড়ন্ত ও পরিপক্ব মশা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি মেলাথিয়ন ইসি-৫ কীটনাশক ব্যবহার করে। উত্তর সিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার মেলাথিয়নের দাম প্রায় ৪৫০ টাকা। সে হিসাবে দক্ষিণ সিটিকে দেওয়া ১৬ হাজার লিটার কীটনাশকের বাজারমূল্য প্রায় ৭২ লাখ টাকা।
দক্ষিণ সিটিকে কীটনাশক ধার দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডিএনসিসির সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ সিটি যে পরিমাণ কীটনাশক চেয়েছিল, তাদের চাহিদা বিবেচনা করেই তা দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ সিটি ওই কীটনাশকের সমপরিমাণ টাকা ঠিকাদারকে দিয়ে দিলেই হবে। পরে ঠিকাদারের কাছ থেকে ওই পরিমাণ কীটনাশক নিয়ে উত্তর সিটি হিসাব সমন্বয় করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার বিস্তার বাড়বে। থেমে থেমে বৃষ্টি হলে মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১১৭ জন। ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪৪ জন। গত মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিছু দিন ধরে প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
কারণ হিসেবে কীটতত্ত্ববিদ ড. ইন্দ্রানী ধর বলেন, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু মশার বিস্তার থাকবে। কারণ এ সময়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে পানি জমে মশার বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। এবার লোডশেডিংয়ের কারণে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমনিতে তীব্র গরম। এ কারণে অনেকে হালকা পোশাক পরিধান করেন। বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ আরও বেশি ঘামে। এই ঘাম মশাকে আকৃষ্ট করে। বিদ্যুৎ না থাকলে রাতে চারদিকে অন্ধকার থাকে। তখন মানুষের শরীরে মশার কামড় দেওয়ার সুযোগ বাড়ে। এ জন্যও ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে।
তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর আক্রান্ত হওয়ার স্থান চিহ্নিত করে তার চারপাশের ৫০০ গজের ভেতরে অভিযান চালাতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে হবে। এবার শঙ্কার বিষয় হলো– ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে ডেন-৩ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি পর্যায়ের মধ্যে তৃতীয়টি।