সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ঠেকাতে আসছে একক দরতালিকা

সরকারি কেনাকাটায় পণ্য ও সামগ্রীর অস্বাভাবিক দর ফারাক এবং অনিয়ম ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন ও একক দরতালিকা (রেট শিডিউল) প্রণয়ন করার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেসব সরকারি সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা নেই, তাদেরও নতুন তালিকা অনুসরণ করে পণ্য ও উপকরণ কেনাকাটা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি। এতে একই ধরনের নির্মাণকাজে দপ্তরভেদে আলাদা দর নির্ধারণের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা।

একক দরতালিকা বলতে দেশের সব এলাকায় একই দরে কাজ করতে হবে, এমনটি নয়। বরং দেশের দুর্গম, পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক (জোনাল) দর রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মূল দরকাঠামো এক হবে, তবে বিশেষ এলাকার অতিরিক্ত ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। যেসব সংস্থার একেবারে নিজস্ব কাজ থাকবে, সে জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে।

এতদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একই ধরনের পণ্যের ক্রয়মূল্যে বিশাল বৈষম্য ও অস্বাভাবিক দাম ধরার প্রবণতা দেখা গেছে। যার একটি উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসের জন্য একেকটি বালিশ ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে শুরু করে অবিশ্বাস্য ৮৯ হাজার ৯০০ টাকায় কেনা হয়েছে।

অপরদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারের জন্য একটি বালিশের প্রস্তাবিত দর ছিল ২৭ হাজার ৭২০ টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে একেকটি গগলসের দাম ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষার ক্ষুদ্রাকার একটি টিউবের দাম ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছিল। কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্যদের ধারণা, দেশের সব প্রকৌশল দপ্তরের জন্য একটি একক দর কাঠামো তৈরি করা হলে একই ধরনের নির্মাণকাজ বা উপকরণ কেনাকাটায় দপ্তরভেদে আলাদা ও ইচ্ছামাফিক দর নির্ধারণের অপসুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। 

এর আগে, গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল পুনর্নির্ধারণ করতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সরকারি সংস্থাগুলোর প্রধান প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগ্য প্রতিনিধিদের রাখা হয়। কমিটি ইতিমধ্যে একাধিক বৈঠক সম্পন্ন করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভ্যাট ও করহার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দরতালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা যেতে পারে। দরতালিকায় অন্তর্ভুক্ত সব নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত সংগ্রহ করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।

প্রতিটি সংস্থার ব্যবহৃত পণ্য ও উপকরণসামগ্রীর একক মূল্য বিবিএসের ওয়েবসাইটে থাকবে। সংস্থা তাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী ওই একক দর ব্যবহার করে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন করবে।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্যসচিব পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারি কেনাকাটায় ইট, রড, সিমেন্ট বালুর মতো যেসব পণ্য ও উপকরণ সব প্রকৌশল সংস্থা সাধারণত ব্যবহার করে থাকে, সেগুলোর একক তালিকা থাকবে। আবার কিছু সংস্থার নিজস্ব কিছু কাজ থাকে, যেটা অন্য কারও থাকে না, তাদের জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে। তিনি বলেন, একক রেট শিডিউলের কাজ প্রায় শেষ। তারা শিগগিরই প্রতিবেদনটি একনেক সভায় তুলে ধরবেন।

প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, স্থির দরতালিকার পরিবর্তে বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় ও কর কাঠামোর পরিবর্তন বিবেচনা করে দরতালিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করতে একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ৮৪ টাকা থাকলেও ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়। এ ছাড়া বিটুমিন, পাথর ও বালুর মতো মৌলিক নির্মাণ সামগ্রীর আন্তর্জাতিক বাজারদর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে সংগৃহীত হয়ে তাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা হবে, যা দেখে সংস্থাসমূহকে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।

তবে পণ্য কেনাকাটায় একক ও অভিন্ন দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন না বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। জাহিদ হোসেন বলেন, সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সরকারি নির্মাণকাজের অনিয়ম ঠেকাতে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধি (পিপিআর) পুরোপুরি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) মাধ্যমে পুরো কেনাকাটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। 

এসময় মূলত সেখানে সংস্কার আনতে হবে। তাহলে পণ্য কেনাকাটায় অনিয়ম কমবে বলেও উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো কোনো সংস্থা কখনো নিজেরা কমিটি গঠন করে বাজারমূল্য দেখে পণ্য ও উপকরণের দাম নির্ধারণ করে। আবার কখনো কখনো আগের বছরের পণ্যের দাম তুলনা করে মূল্যস্ফীতি দেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে থাকে। এ কারণে একেক সংস্থার পণ্যের দাম ভিন্ন ভিন্ন হচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের দাম নির্ধারণে কোনো দরতালিকা নেই।

বর্তমানে গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব দরতালিকা রয়েছে; তবে জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সেতু বিভাগের নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই। অভিন্ন রেট শিডিউল চালু হলে দপ্তরগুলোর মাঝের এই চরম বৈষম্য দূর হবে।