কুমিল্লায় মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত’ পড়ার ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা মো. আনোয়ার হোসেনকে (৪৫) নিজ বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানের সামনে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টার দিকে জেলার নবগঠিত বাঙ্গরা উপজেলার উত্তর পেন্নাই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আনোয়ার ওই উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য এবং একই ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি উত্তর পেন্নাই গ্রামের মৃত মনু মিয়ার ছেলে।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় লোকজন জানান, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের পক্ষে কাজ করেন। অন্যদিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সরকারের পক্ষে কাজ করেন। ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন পরাজিত হন। এ নিয়ে ফিরোজ ও আনোয়ারের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে আনোয়ার এলাকা ছেড়ে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি একাধিকবার এলাকায় ফেরার চেষ্টা করেন।
নিহত আনোয়ারের স্ত্রী মোমেনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, তার স্বামী প্রায় আড়াই বছর ধরে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন। শনিবার গভীর রাতে তিনি গোপনে বাড়িতে ফেরেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় আনোয়ারকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাকেও আহত করা হয়।
মোমেনা আরও বলেন, হামলার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে এলাকায় ডাকাত পড়েছে বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। আহত স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় সকাল ৬টার দিকে আনোয়ারকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুস শাকিল বলেন, হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষা করে আনোয়ারকে মৃত পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।
আনোয়ারের চাচাতো ভাই মো. জসিম উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে গ্রামে ফেরার চেষ্টা করলে ফিরোজ হোসেনের লোকজন আনোয়ারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করছিল। চাঁদা না দিলে এলাকায় এলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে আনোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে।
আনোয়ারের মেয়ের জামাতা মো. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তার শ্বশুর আওয়ামী লীগ করতেন এবং দীর্ঘদিন এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তার শাশুড়ি বাড়িতে থাকেন। রাতে আনোয়ার বাড়িতে এসে একটি কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম সরকার গ্রুপের লোকজন ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আনোয়ার হোসেন বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। এতে এলাকার লোকজন তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। গভীর রাতে তিনি বাড়ি ফিরেছেন জানতে পেরে ক্ষুব্ধ লোকজন ঘরে ঢুকে তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন ফিরোজ।
বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মো. শফিউল আলম বলেন, আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।