সুটকেসে না ধরায় প্রেমিকার মরদেহ দুই টুকরো করেন প্রেমিক

গাজীপুরের মহাসড়কের পাশের খাল থেকে উদ্ধার হওয়া অর্ধগলিত ও খণ্ডিত নারীর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে ওই নারীকে হত্যার ঘটনায় তার কথিত প্রেমিক, প্রেমিকের মা ও এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের দাবি, বিয়ের জন্য চাপ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ওই নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে পরিচয় গোপন ও লাশ গুমের উদ্দেশ্যে মরদেহ দুই টুকরো করে একটি স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গাজীপুর জেলার পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।

নিহত নারীর নাম ডলি আক্তার (৩০)। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর গাজীপুরের বানিয়ারচালা এলাকায় ভাড়া থেকে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

গত শুক্রবার বিকেলে সদর উপজেলার ভবানীপুর এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তদন্তে তার পরিচয় শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন।

পিবিআই জানায়, শুক্রবার বিকেলে জয়দেবপুর থানার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের খালের পানিতে একটি সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা দেখতে পায় পুলিশ। পরে সুটকেস ও বস্তা থেকে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। এরপর নিহতের পরিচয় শনাক্তসহ ছায়া তদন্ত শুরু করে গাজীপুর পিবিআই।

তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যায় জড়িত সন্দেহে মিশন ইসলাম, তার মা বানু আক্তার ও মিজানুর রহমান মিল্টনকে শনাক্ত করা হয়। পরে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর মহানগরের বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড
জিজ্ঞাসাবাদে পিবিআই জানতে পারে, ডলি আক্তার ও মিশন ইসলাম একই কারখানায় কাজ করার সুবাদে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় গেলে সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে মিশন ও ডলি একই কক্ষে এবং বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে যান।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, রাতে বিয়ে ও পূর্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিশন ও ডলির মধ্যে কথা কাটাকাটি ও বিরোধ হয়। একপর্যায়ে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন মিশন। তিনি ডলিকে ঘুমের ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ান। ডলি ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২টার দিকে লুঙ্গি পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মিশন। পরে মরদেহ চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখেন।

পরদিন সকালে ঘর ঝাড়ু দেওয়ার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান। এরপর মা-ছেলে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন। তারা বাজার থেকে একটি সুটকেস কিনে আনেন। কিন্তু মরদেহ সুটকেসে না ধরায় ব্লেড সংগ্রহ করেন। পরে বটি, দা ও ব্লেড দিয়ে মরদেহটি কোমর থেকে দুই খণ্ড করা হয়। এক খণ্ড সুটকেসে এবং অপর খণ্ড পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।

মরদেহ গুম করতে মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনে সহযোগিতার কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন বাসায় এসে সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে দেন। পরে মিশন, বানু ও মিল্টন অটোরিকশায় রাজেন্দ্রপুর যান। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ভবানীপুর ব্রিজ এলাকায় গিয়ে সুটকেস ও বস্তাটি খালের পানিতে ফেলে দেন।

পিবিআই জানায়, এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে তিনি সুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী আছে তা মিশনের কাছে জানতে চান। তখন মিশন সেখানে ডলির মরদেহ থাকার কথা জানান। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় চলে যান।

গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিশনের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে হত্যায় ব্যবহৃত বটি ও দা, মরদেহ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, নিহত ডলির জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়।

গাজীপুর পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, মরদেহ পচে যাওয়ায় প্রথমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। পরে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত সোর্সের সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।