দেশীয় উৎপাদনের সংকট ও চড়া দামের কারণে বাড়ছে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি

একসময়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইলিশ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন অদ্ভুত এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দেশের বাজারে পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রতিবেশী ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস তথা জুলাই ও আগস্টে ১৯টি নিবন্ধিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন লাখ কেজির (৩৫০ টন) বেশি ইলিশ আমদানি করেছে। দেশীয় বাজারে ইলিশের তীব্র সংকট, মাছের আকাশছোঁয়া দাম এবং আমদানিকৃত মাছের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এই বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছেন।

আমদানির নেপথ্য কারণ ও গুজরাটি ইলিশের আধিক্য:

সংশ্লিষ্ট সূত্র, কাস্টমস কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী দূষণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন, কারেন্ট জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন এবং সমুদ্রপথে অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকারের কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে দেশীয় বাজারে পদ্মার ইলিশের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং ভালো মানের এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

এর বিপরীতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, বিশেষ করে গুজরাটের ভারুচ ও নর্মদা নদীর মোহনা অঞ্চলে এ বছর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়েছে, যার ফলে সেখানে মাছের উদ্বৃত্ত জোগান ও অপেক্ষাকৃত কম দাম নিশ্চিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, গত দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে, যার সিংহভাগই আসছে সুদূর গুজরাট থেকে। গুজরাটের এই ইলিশগুলো আকৃতিতে বড় এবং প্রচুর ডিমে ভরপুর থাকায় বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর চাহিদা রয়েছে। কম দামে কিনে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে আনার পর কম খরচে বিক্রি করা সম্ভব হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের বিশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে এই আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কারণ আইনগতভাবে ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। তবে বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের সিংহভাগ (প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ) যে দেশটিতে উৎপন্ন হয়, সেই দেশেই ভারতের মাছের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগের বিষয়।

ইলিশ গবেষকরা মনে করছেন, ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট বা চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। চার শ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নেওয়া বিগত ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ সংশ্লিষ্টরাই। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, কেবল সাময়িক আমদানির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে, বরং ইলিশের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, নতুবা ঐতিহ্যবাহী এই মাছের বাজার চিরতরে হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এখন বাংলাদেশ শুধু আমদানি করছে তা নয়। গত অর্থবছরে ইলিশ রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চরম ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। কর্মকর্তারা বলছেন, বারশ টন রফতানির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সেবার ১১০ টনেরও কম ইলিশ রফতানি করেছে। যদিও ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্প ২০২০ সালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি কতটা কার্যকর হয়েছে এখন সেই প্রশ্নও তুলেছেন মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডঃ মোঃ খালেদ কনক নিজেও।

তিনি বলেন, ‘ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য চারশ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। গত সরকারের সময়ে সেটি কতটা কাজে লাগল কিংবা গাফিলতি ছিল কি-না সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। ইলিশ উৎপাদন কমলো কেন সেটি বের করতে হবে।’

ভারত থেকে ইলিশ আমদানি সরকার কিভাবে দেখছে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ না এবং অল্প স্বল্প আগেও বিভিন্ন সময় এসেছে। এবার বাজারে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আবেদনে সীমিত পরিসরে কিছু আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ সাগরের মাছ। প্রজননের জন্য নদীতে আসে। সমুদ্র থেকে হয়তো ওরা (ভারতীয়রা) ধরে ফেলছে। আমাদের মজুত কমছে। এসব কারণেই অল্প পরিমাণে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

যদিও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের কয়েকজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয় মূল্য পড়ে দুই ডলার ( প্রায় ২৪৬ টাকা) কিংবা তারও কম। এরপর দেশে কাস্টমসসহ নানা শুল্কসহ বিভিন্ন ব্যয় শেষে এর যা দাম পড়ে তা বাংলাদেশের বাজারের একই ওজনের একটি ইলিশের চেয়ে অনেক কম।

বাজারে সংকট কতটা

গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকার বাজারে দেখা গেছে ৫শ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ ১৬০০ টাকা, ১ কেজির ওপরে ২৮০০, আটশ/নয়শ গ্রামের মাছ ২২-২৪শ এবং ৭শ গ্রামের ইলিশ ১৮শ টাকা কিংবা এসব দামের কাছাকাছি মূল্যে বিত্রি হচ্ছে। অথচ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। এছাড়া পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এখন বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করে থাকে।

কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। পরের বছর ২০২৩-২৪ সময়ে উৎপাদন হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন আর ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসেব না পাওয়া গেলেও কর্মকর্তারা যে ধারণা দিয়েছেন তাতে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টনেরও কম।

 

গুজরাতে ইলিশের বিপুল জোগান

এ বছর গুজরাতে ইলিশের বিপুল জোগান হয়েছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানীকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ। ফলে সেখানে মাছের উদ্বৃত্ত জোগান তৈরি হয়েছে এবং দামও কমেছে। তার বক্তব্য, বাংলাদেশে শুধু ইলিশেরই নয়, ইলিশের ডিমেরও বড় চাহিদা রয়েছে। আর গুজরাত থেকে আসা ইলিশে প্রচুর পরিমাণে ডিম পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্রেতারা ডিম-সহ বড় আকারের ইলিশ পছন্দ করেন। আবার সেখানকার কারখানাগুলিতে ইলিশের ডিম প্রসেসিং, প্যাকেজিং করে আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানিও করা হয়। গুজরাতের ইলিশ আকারে বড় এবং ডিমে ভরা থাকে। ফলে বাংলাদেশে ইলিশ এবং ইলিশের ডিম, দু'টিরই বড় চাহিদা রয়েছে, যা গুজরাতের মাছ দিয়ে আমরা মেটাতে পারছি।’

মাকসুদের মতে, এখন ইলিশের এই বাণিজ্যিক পথটি মূলত গুজরাতের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারুচের ভাদভূতের কাছে মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন খুবই ভালো হয়েছে। মূলত পশ্চিমবঙ্গেই এই মাছ পাঠানো হয়, সেখান থেকে তা বাংলাদেশেও রফতানি করা হয়।

তিনি বলেন, গুজরাত থেকে পাঠানো ইলিশের সবচেয়ে বেশি চাহিদা পশ্চিমবঙ্গেই। ভাদভূত থেকেও রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে সরাসরি বাংলাদেশে মাছ পাঠানো হয়। পরিমাণ কম হলে ট্রেনের কনটেনারে পাঠানো হয়, তবে সাধারণত পরিমাণ বেশি হলে ট্রাকই ব্যবহার করা হয়। তার মতে, প্রতিদিন ভারুচ থেকে তিনটি ট্রাক ছাড়ে, প্রতিটিতে গড়ে ২৫০টি বাক্স থাকে। প্রতি বাক্সে থাকে ৬০ কেজি ইলিশ।

হাওড়ার কালীবাবুর বাজার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রথীকান্ত বার দাবি করেন, এই বছর বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও পশ্চিমবঙ্গের বাজারে এসে খুচরো পরিমাণে, প্রায় দেড় থেকে ৩ মেট্রিক টন, ইলিশ কিনছেন। তবে তারাও গুজরাত ও মহারাষ্ট্র থেকে আসা বড় আকারের ইলিশই বেশি পছন্দ করছেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা