দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে যখন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের বড় একটি অংশকে সংসার চালাতে নিয়মিত সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ঠিক তখনই ব্যাংকিং খাতে সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র দেখা যাচ্ছে।
দেশের বিত্তশালী শ্রেণি ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেশের অর্থনীতিতে এই বৈপরীত্য ও আয় বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিন মাসে কোটি টাকার হিসাব বেড়েছে পাঁচ হাজারের বেশি:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতজুড়ে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। এর ঠিক তিন মাস আগে অর্থাৎ গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। সে হিসেবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশে কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।
সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টিতে, যেখানে মোট আমানতের পরিমাণ পৌঁছেছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। এর আগের ত্রৈমাসিকে অর্থাৎ মার্চ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক আমানতও ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতির দুই মেরুর চিত্র ও আমানত বৃদ্ধির কারণ:
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনীতির এই দুই বিপরীতমুখী চিত্র মূলত সমাজে সম্পদ বণ্টনের ব্যবধানকেই ফুটিয়ে তোলে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হচ্ছে এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই ব্যাংক বা সঞ্চয়ের আগের জমানো অর্থ তুলে নিচ্ছেন; অন্যদিকে বড় ব্যবসা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং ধনী শ্রেণির একটি অংশের আয় ও ব্যাংক আমানত অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের বাইরে থাকা অলস বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কিছু অর্থ আস্থার পরিবেশ পেয়ে আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসায় সামগ্রিক আমানত বাড়তেও ভূমিকা রাখছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এক কোটি টাকার বেশি থাকা হিসাবের এই পরিসংখ্যান দিয়ে ঠিক কতজন প্রকৃত ‘কোটিপতি’ ব্যক্তি রয়েছেন তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, কারণ এসব হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি এবং সরকারি সংস্থার হিসাব যুক্ত থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করে থাকে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কোটিপতি হিসাবের ধারাবাহিক বৃদ্ধি:
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা মাত্র ৫ জন থাকলেও পরবর্তী দশকগুলোতে এই সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে কোটি টাকার হিসাব ছিল ৯৪৩টি, ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টিতে এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে উন্নীত হয়।
এরপর বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারী ও পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এই ধারা থেমে থাকেনি; বরং ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে পৌঁছায়। পরিশেষে চলতি বছরের জুনে তা ১ লাখ ৪১ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মাঝে সমভাবে না পৌঁছে বরং নির্দিষ্ট একটি বিত্তশালী শ্রেণির হাতে কুক্ষীগত হওয়ার ইঙ্গিতই বহন করছে।