জীবনের পরতে পরতে আমরা নানা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি। এসব গুনাহ আমাদের জীবনকে করে কলুষিত, মনকে করে উদ্বিগ্ন।
গুনাহ মূলত দুই ধরনের—অন্তরের গুনাহ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহ। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহের মধ্যে আছে—অন্যের সতর বা গোপনীয় অঙ্গের দিকে তাকানো, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা শোনা, মিথ্যা বলা, গিবত করা, চোগলখোরি করা, উপহাস করা, অসত্য ও অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়া এবং নিরপরাধ নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া। আর অন্তরের গুনাহের মধ্যে আছে—অহংকার, আত্মপ্রবঞ্চনা, লোক-দেখানো ইবাদত বা রিয়া, কৃপণতা, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, হিংসা ও বিদ্বেষ।
দাম্পত্য জীবনে গুনাহের প্রভাব
স্বামী-স্ত্রীর জীবন যখন আল্লাহর অবাধ্যতার মধ্যে পরিচালিত হয়—চোখের গুনাহ, কানের গুনাহ, জিহ্বার গুনাহ কিংবা অন্য কোনো পাপাচারের মাধ্যমে, তখন ধীরে ধীরে সেই গুনাহ তাদের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
যে ভালোবাসা একসময় হৃদয়কে কাছে এনেছিল, তা ধীরে ধীরে বিদ্বেষে পরিণত হয়। যে দুজন একে অপরের জন্য ব্যাকুল থাকত, তাদের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হয়। যে সম্পর্ক ছিল ভালোবাসা ও সম্প্রীতিতে পূর্ণ, সেখানে জন্ম নেয় দূরত্ব, বিরক্তি ও অশান্তি। এর সঙ্গে অতীত বা বর্তমানের পাপের সম্পর্ক থাকতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই আসে। আর তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৩০)
ফুদাইল বিন ইয়াজ (রহ.) বলেন, ‘আমি যখন কোনো গুনাহ করি, তখন তার প্রভাব আমার স্ত্রীর খারাপ আচরণ এবং আমার বাহনের হোঁচট খাওয়ার মধ্যেও দেখতে পাই।’ এটি আমাদের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা—গুনাহের প্রভাব শুধু আখিরাতেই পড়ে না; বরং তা দুনিয়ার জীবনেও মানুষের শান্তি, সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিবেশকে নষ্ট করতে পারে।
গুনাহে পতিত হওয়া মানুষের স্বভাবের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতিকে আনতেন, যারা গুনাহ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত; অতঃপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৯)
মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর সর্বোত্তম ভুলকারীরা হলো যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৯৯)
তাই কোনো স্বামী বা স্ত্রী গুনাহে জড়িয়ে পড়লে হতাশ হওয়ার কারণ নেই; বরং তাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, আন্তরিকভাবে তাওবা করা, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং সেই গুনাহ পরিত্যাগ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : আয-যুমার, আয়াত : ৫৩)
স্মরণীয় যে নিজের প্রতি, নিজের জীবনসঙ্গীর প্রতি এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি কোমল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না। শয়তান যেন আপনার গুনাহকে এত বড় করে না দেখায় যে আপনি তাওবার আশা হারিয়ে ফেলেন। আবার অন্যের গুনাহ নিয়ে তাকে অপমানও করবেন না; বরং তার সামনে আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দিন। তাকে তাওবার আশা দিন। তাকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আসতে সাহায্য করুন।
ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ ছিলেন যারা চুরি, ব্যভিচার বা মদ্যপানের মতো গুরুতর গুনাহে পতিত হয়েছিলেন; কিন্তু পরে আন্তরিকভাবে তাওবা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেছিলেন। অবশ্যই গুনাহ গুরুতর বিষয়। কিন্তু আপনি যেন আপনার ভাই, বোন, স্বামী বা স্ত্রীকে শয়তানের হাতে আরো ঠেলে না দেন। কাউকে তার গুনাহের জন্য এমনভাবে অপমান করবেন না, যাতে সে হেদায়েতের পথ থেকেই দূরে সরে যায়।
দাম্পত্য জীবন শুধু ভালোবাসা, অর্থ, সৌন্দর্য কিংবা পারস্পরিক আকর্ষণের ওপর টিকে থাকে না। এর প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি, ঈমান, আমল, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহর আনুগত্য। যখন স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন তাদের সম্পর্কও সুন্দর হতে শুরু করে।