নতুন পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন, নিচের গ্রেডে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট

নতুন জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও উচ্চতর গ্রেডে এ হার ধাপে ধাপে কমবে। গ্রেড-৫-এ ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় সেই অভিন্ন হার আর থাকছে না। ফলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূল বেতন বেশি হলেও শতাংশের হিসাবে প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সশস্ত্র বাহিনীতেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেলে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনাও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হবে। এই প্রণোদনা প্রথমে ৫ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৈরি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।

নতুন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করা। তবে আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কমছে বাড়ি ভাতা

নতুন পে-স্কেলের অন্যতম বড় পরিবর্তন আসছে বাড়ি ভাতা ব্যবস্থায়। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এ হার হবে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। আর সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে মূল বেতনের তুলনায় বাড়ি ভাতার হার কমলেও গ্রেডভেদে মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ায় ভাতার টাকার অঙ্ক বাড়বে। অর্থাৎ ভাতার শতাংশ কমিয়ে মূল বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

আট বছরেই উচ্চতর গ্রেড

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে ছয় বছর চাকরির শর্ত থাকছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন।

অন্যদিকে যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পাবেন। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর এ সুবিধা পাওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।

চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতায় পরিবর্তন

চিকিৎসা ভাতাতেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে সব কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীরা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীরা ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা পাবেন।

প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল পান। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহণ খরচ বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি ছোট ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে।

তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।

নতুন কাঠামোয় ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামোও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীতেও পরিবর্তন

জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করেছে সচিব কমিটি। এর মধ্যে অফিসার ও সদস্যদের প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা, শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। জরিপ ভাতার পরিমাণ বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।

তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি ও বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ হবে।

সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।