ঢাকায় শিশু গৃহকর্মী তানিয়া আক্তারকে গরম খুন্তির ছ্যাঁকায় শরীর ঝলসানোসহ নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে কলাবাগান থানার পুলিশের একটি বিশেষদল অভিযান চালিয়ে রাজধানীর গ্রীণরোডের ‘গ্রীণ কর্নার’ নামে একটি বাসা থেকে তাদের আটক করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন- গৃহকর্ত্রী মোর্শদা আক্তার (৩৮) ও তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলকে (৪৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিশু গৃহকর্মীর ওপর চালানো অমানুষিক নির্যাতনের খবর ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশ তৎপর হয়। কলাবাগান থানার পুলিশের একটি দল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযুক্ত নারীর অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে অভিযান পরিচালনা করে গ্রীণরোডের গ্রীণ কর্নার বাসা থেকে মোর্শেদা আক্তার ও তার স্বামী সাইফুদ্দিনকে আটক করে।
কলাবাগান থানার ওসি মো. ফজলে আশিক জানান, শিশু গৃহকর্মী তানিয়াকে নির্যাতনের অভিযোগে মোর্শেদা আক্তার ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেলকে আসামী করে থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে।
ভিকটিমের বাবা বেলাল হোসেন, বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় আসামীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওসি জানান, বুধবার আসামিদের আদালতে সোর্পদ করা হলে আদালত তাদের কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন।
জানা যায়, নির্মম নির্যাতনে ক্ষত বিক্ষত শিশু তানিয়া বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। চিকিৎসক বলেছেন, তার অবস্থা আশংকাজনক।
তানিয়া খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামের দিনমজুর বেলাল হোসেনের মেয়ে।
জানা যায়, মা মারা যাওয়ার পর অভাবের তাড়নায় বছর দেড়-এক আগে মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে তানিয়াকে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠায় বেলাল। তবে মেয়েকে ঢাকার কোন ঠিকানায় কিংবা কার কাছে নেওয়া হচ্ছে, তার কিছুই জানতেন না অসহায় বাবা। প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাসায় তানিয়াকে দিয়ে আসা হয় এক মহিলার বাসায়। পরে সেখান থেকে ওই মহিলা ঢাকার কলাবাগানের গ্রীণ রোডে তার বোন মোর্শেদা আক্তারের বাসায় পাঠায় তানিয়াকে। মোর্শেদা একটি স্কুলের শিক্ষক ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন ল্যাপটপের ব্যবসা করেন।
তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাড়িতে তার দিন কাটত ভয় আর নির্যাতনের মধ্যে। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। বেদম প্রহার করতো গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা। দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। বছরের বেশি সময় ধরেই তার ওপর প্রায় প্রতিদিনই চলে এমন নির্যাতন। স্ত্রীর এমন নির্মম নির্যাতনে স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেল কোন বাধা দিতেন না। বরং স্ত্রীকে সহযোগিতা করতেন।
দেড় বছর ধরে মেয়েটি কীভাবে দিন কাটিয়েছে, তার খবরও জানতেন না বাবা। ঢাকায় যাওয়ার পর একবারও মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি তাকে। ফোন করলেও কথা বলতে দেয়া হয়নি বাবার সঙ্গে।
কয়েকদিন আগে মাথায় এবং থুতনিতে গুরুতর আঘাতের তানিয়াকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে সেখান থেকে গত শুক্রবার রাত ৩টার দিকে তাকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন বাবা । হাসপাতালে বেড না পাওয়ায় মেঝেতেই শুইয়ে চলছে তার চিকিৎসা।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, ‘শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অভুক্ত ও চরম নির্যাতনের কারণে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, সে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না। তিনি বলেন, ‘তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’