এক সময়ের ব্যস্ততম ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লিতে এখন নেই কর্মচাঞ্চল্যের ছিটেফোঁটাও। তাঁতের খটখট শব্দে মুখর সেই জনপদে নেমেছে নীরবতা। ভারতীয় কম দামের শাড়ির দাপটে বাজার হারাচ্ছে দেশীয় হাতে বোনা বেনারসি। কাজ হারাচ্ছেন কারিগররা। বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ কারখানা। অস্তিত্বসংকটে পড়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই তাঁতশিল্প।
ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লির একসময়কার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কয়েক হাজার কারিগর ও শতাধিক তাঁতঘরে দিন- রাত চলত শাড়ি তৈরির কাজ। এখন সেই কর্মচাঞ্চল্য অতীত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা, বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ তাঁতঘর।
পল্লি ঘুরে জানা যায়, পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লির ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে ভারত থেকে আসা কারিগররা এখানে বসতি স্থাপন করেন। তাদের দক্ষ হাতে কাতান ও বেনারসি শাড়ি বুননের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় কারিগররা।
তাঁতশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২008 সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ঈশ্বরদীর ফতেমোহাম্মদপুর এলাকায় সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেনারসি পল্লি প্রতিষ্ঠা করে। ২০ বছরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধায় ৯০ জন তাঁতিকে ৯০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০টি প্লট ৩ শতাংশ এবং ২০টি প্লট ৫ শতাংশ আয়তনের।
তবে ৯০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাত্র সাতটিতে কারখানা স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ফলে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বেনারসি পল্লিটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত ও নিস্তব্ধ।
কারিগর ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভারতীয় স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি কম দামের শাড়ি বাজার দখল করে নেওয়ায় দেশীয় হাতে বোনা বেনারসির চাহিদা কমে গেছে। মেশিনে দ্রুত ও কম খরচে শাড়ি উৎপাদন সম্ভব হলেও হাতে বোনা শাড়িতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগে। ফলে দামের প্রতিযোগিতায় দেশীয় তাঁতশিল্প পিছিয়ে পড়ছে।
বেনারসি পল্লির তাঁত মালিক ও কারিগররা জানান, সরকারি উদ্যোগে পল্লিটি গড়ে উঠলেও প্রত্যাশিত সংখ্যক তাত মালিক সেখানে কারখানা স্থাপন করেননি। অন্যদিকে, যেসব কারখানা চালু ছিল, তার অনেকগুলোই উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকসংকট ও বাজারের প্রতিযোগিতায় বন্ধ হয়ে গেছে।
একজন তাত মালিক বলেন, 'আগে এখানে প্রায় ১ হাজার তাত ছিল। এখন কমে ৪০ থেকে ৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সহায়তা, সহজ কিস্তি ও বাজার সুবিধা পেলে আমরা এই শিল্পকে আবার দাঁড় করাতে পারতাম। নতুন প্রজন্মও আর এ পেশায় আসতে চায় না। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো এই শিল্প হারিয়ে যাবে।'
ব্যবসায়ী মো. জাবেদ খান বলেন, 'আমার বাবা বেনারস থেকে এসে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ভারতীয় শাড়ির দাপটে আমরা আর তাঁত টিকিয়ে রাখতে পারছি না। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারিগরদের ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।'
শাড়ি ব্যবসায়ী ওয়াকিল খান বলেন, 'ভারতে মেশিনে কম খরচে দ্রুত শাড়ি তৈরি করা হয়। সেখানে আমরা হাতে একটি শাড়ি তৈরি করতে বেশি সময় ও শ্রম দেই। ফলে উৎপাদন খরচও বেশি হয়। এই অসম প্রতিযোগিতায় দেশীয় তাঁতশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সমন্বয়, সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং দেশীয় বাজারে কার্যকর সুরক্ষা। পাশাপাশি দেশীয় বেনারসির প্রচার ও বাজার সম্প্রসারণেও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাঁত মালিক ও কারিগরদের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি শুধু হারিয়ে যাবে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু কারিগর পরিবারের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।