চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাশ করেও ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদনই করেননি। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই এসব শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ল কি না; তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পাশ করেও তারা কেন একাদশে ভর্তির আবেদন করেননি, তাদের কতজন অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যাচ্ছেন কিংবা কতজন পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছেন, এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই শিক্ষা প্রশাসনের কাছে।
তবে অতীতের একাধিক জরিপ ও পরিসংখ্যান বলছে, আগে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ৪০ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে। ৭ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পারিবারিক অসচ্ছলতার জন্য কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছেন। বাকিরা অসুস্থতাসহ নানা কারণে ঝরে পড়েছেন। প্রায় ৫১ শতাংশ আর পড়াশোনাই করেননি।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই তিন বিভাগ মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেন ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। গত বুধবার রাত ৮টায় একাদশে ভর্তির প্রথম পর্বের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদনকারী মোট ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করা সত্ত্বেও নির্বাচিত হননি। এছাড়া ১৪ হাজার ৪১৫ জন আবেদনকারী আসন পাননি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী পেতে হাহাকার দশা শুরু হয়েছে। ১১টি কলেজে ভর্তির জন্য কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেননি। আরো ৪১৬টি কলেজে আবেদন জমা পড়লেও সেগুলোর কোনোটিই কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। এছাড়া প্রায় ৮০০ কলেজ-মাদ্রাসা এবার মাত্র ১ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে। ফলে অনেক কলেজেই শিক্ষার্থীর সংকট দেখা দিয়েছে। এ বছর যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ হাজার ১৮০টি। শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রম অনুযায়ী মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশ করা হবে আগামীকাল শনিবার রাত ৮টায়। এরপর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম চলবে।
একাদশে ১৫ লাখ আসন ফাঁকা থাকবে :সারা দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে ২৫ লাখের বেশি আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে এবার একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৫ লাখ আসন খালি থেকে যাবে। অনেক কলেজ ন্যূনতম শিক্ষার্থীও পাবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক কলেজের সামনে এখন আর আসন পূরণের চিন্তা নয়, বরং ন্যূনতম সংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে কি না সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যেসব কলেজ আশপাশের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল, সেসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে পাশ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে একাদশের ভর্তি ও শ্রেণি কার্যক্রমে। ফলে শহরের কলেজে যখন ‘কোথায় ভর্তি হবে’ তা নিয়ে প্রতিযোগিতা, তখন মফস্সল ও গ্রামের অনেক কলেজ ন্যূনতম শিক্ষার্থী মিলবে কি না সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
যে ১০ কলেজে আবেদন বেশি :এদিকে নামিদামি হিসেবে পরিচিত কিছু কলেজে ভর্তি হতে আসনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আবেদন করেন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। কলেজটিতে একাদশ শ্রেণিতে ৯৮১টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ৩২ হাজার ৬৭৮ জন শিক্ষার্থী। আবেদনের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। কলেজটিতে ২ হাজার ৩৭৯টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ৩২ হাজার ৬৪০ জন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা সিটি কলেজে ৪ হাজার ২৮০টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ৩১ হাজার ৯৫১ জন। আবেদনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ কলেজের তালিকায় আরো রয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ-ঢাকা, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ ও সরকারি তোলারাম কলেজ।
যে কারণে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী কোনো কলেজ পাননি :এদিকে রাজধানী ও বড় শহরের নামি কলেজগুলোতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পছন্দের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। এ কারণে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে আবেদন করেও জিপিএ-৫ পাওয়া ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী কোনো কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হননি। জানা গেছে, একাদশে ভর্তির জন্য এসএসসি পাশ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। সেখানে সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে চয়েজ বা পছন্দক্রম দিতে পেরেছিল শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে এসএসসির ফল বিবেচনায় নিয়ে তাদের কলেজ মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো শিক্ষার্থী যদি তার পছন্দের তালিকায় ১ নম্বরে রাখে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তাহলে ঐ কলেজে কতসংখ্যক আসন ফাঁকা রয়েছে এবং শিক্ষার্থীর ফলাফল অনুযায়ী অন্যদের চেয়ে তার অবস্থান কী, তা বিবেচনা করা হয়। যদি তার চেয়েও ভালো ফল বা বেশি নম্বর থাকা শিক্ষার্থীরা ভিকারুননিসা কলেজ পছন্দক্রমে দেয়, তাহলে তাকে ঐ কলেজ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। তার পছন্দক্রম ২ নম্বরে কোন কলেজ তা বিবেচনা করা হয়। এভাবে একের পর এক পছন্দক্রম বিবেচনায় নিয়ে এবং এসএসসির ফল বিশ্লেষণ করে একজন শিক্ষার্থীকে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ভর্তি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ায় তারা শুধু ভালো দুই থেকে তিনটি কলেজ পছন্দক্রমে দেন। সেই কলেজগুলোতে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে দেখা যায়, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাড়া কেউ সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকছে না। এমনকি জিপিএ-৫ পেলেও নম্বর কম-বেশির কারণে কেউ পছন্দের কলেজ পায়, আবার কেউ পায় না। ঠিক এ কারণেই ২ হাজার ২০৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েও কলেজ পায়নি।
শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঐ শিক্ষার্থীরাও ভর্তির সুযোগ পাবেন। তবে আবেদনের সময় তারা কম কলেজে চয়েজ (পছন্দক্রম) দেওয়ায় এ সমস্যায় পড়েছে। পরবর্তীকালে আসন শূন্য থাকা সাপেক্ষে তাদের পছন্দের কলেজে অথবা নতুন করে পছন্দক্রম নিয়ে তাদের জন্য আসন বরাদ্দ দেওয়া হবে।
গ্রামের কলেজে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে :নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মফস্সলের পাঁচটি কলেজের পাঁচ জন অধ্যক্ষ ইত্তেফাককে বলেন, আশপাশের বিদ্যালয়গুলোতে পাশের হার কম হওয়ায় সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। আবার যারা পাশ করেছে, তাদের একটি অংশ জেলা শহর বা তুলনামূলক ভালো কলেজে যেতে চায়। ফলে গ্রামের কলেজে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, শিক্ষার্থীদের শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে। পাশ করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্থানীয় কলেজে না পড়ে জেলা শহর কিংবা বড় শহরের তুলনামূলক ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে চায়। এতে গ্রামীণ কলেজের শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে ফাঁকা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।