দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে দুই প্রতিবেশী দেশে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময় নির্ধারণ নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সফরটি আয়োজন করা সম্ভব কি না, তা নিয়েই মূলত কথাবার্তা হচ্ছে।

ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এর এক দিন আগে শুক্রবার ভারতের আরেক ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, আগামী নভেম্বরেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আয়োজনের চেষ্টা চলছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে আয়োজিত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরই তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন করে তৎপরতার তথ্য সামনে এসেছে। ব্রিকসের আয়োজক দেশ ভারত বর্তমানে আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ার বাংলাদেশকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি।

এর আগে অবশ্য আগস্টে তারেক রহমানকে দিল্লিতে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে লিখেছে পত্রিকাটি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সফর হয়নি।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি থেকে অডিও লিংকের মাধ্যমে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার পর বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ওই ঘটনার পরই তারেক রহমানের ভারত সফর পিছিয়ে যায়।

সফরের সময় নিয়ে আলোচনা

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে একক দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানায় নয়াদিল্লি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং নয়াদিল্লির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সফরের প্রস্তুতি ও সময় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। দুই পক্ষ এমন একটি তারিখ নির্ধারণের চেষ্টা করছে, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়সূচির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে জটিলতাস

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনা দেখা দিলেও গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তার প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়ে আসছে।

তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তার প্রকাশ্য বক্তব্যের বিষয়টি এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ঢাকার পক্ষ থেকে চাওয়া হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ নিয়ে ভারত কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান জানানো হোক দিল্লির পক্ষ থেকে। তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে দিল্লি এখনো নির্দিষ্ট কোনো জবাব দেয়নি।

ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি একদিকে যেমন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে, তেমনি তারেক রহমানের সফর আয়োজনের ক্ষেত্রেও এটি একটি জটিলতা তৈরি করেছে। দুই পক্ষই এখন এমন একটি ‘মাঝামাঝি পথ’ খুঁজছে, যাতে শেষ পর্যন্ত সফরটি আয়োজন করা সম্ভব হয়।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি ‘পর্যালোচনা করা হচ্ছে’। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ–মুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারত বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলোও বাংলাদেশের বিভিন্ন অনুরোধের পাশাপাশি আলোচনায় রাখতে চায় বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে দুই পক্ষই সচেতন। দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী ও কার্যকর সম্পর্ক থাকলে উভয় পক্ষই তা থেকে লাভবান হতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।