‘জলাবদ্ধতা-বর্জ্য-যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন সামনে রেখে নাগরিক সমস্যা সমাধান ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুব বিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ। তিনি বলেছেন, ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যানজটসহ দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা-বর্জ্য-যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’ একই সঙ্গে নাগরিক সেবা সহজ ও জবাবদিহিমূলক করা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো নাগরিক সেবা দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে পাওয়া। জলাবদ্ধতা, বর্জ্য, যানজট, সড়কের দুরবস্থা ও ফুটপাত দখলের মতো সমস্যা শুধু মানুষের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি করে না, নগরজীবনের সামগ্রিক মানকেও প্রভাবিত করে। এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ঢাকা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই পানি সরানোর উদ্যোগ নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, জলাধার, পাম্পিং স্টেশন ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

‘জলাবদ্ধতার সমাধান শুধু বৃষ্টি হলে পানি সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, জলাধার, পাম্পিং ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে,’ বলেন মীর নেওয়াজ।

তার মতে, খাল-নালা দখল ও ভরাট বন্ধের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঢাকা দক্ষিণের অন্যতম বড় নাগরিক সমস্যা উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবহন, পৃথকীকরণ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা—পুরো প্রক্রিয়াকে আধুনিক করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন শহর গড়তে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, নির্দিষ্ট স্থানে পরিবহন, বর্জ্য পৃথকীকরণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে হবে।’

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণ না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেন।

ঢাকা দক্ষিণের যানজট প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, শুধু সড়ক সম্প্রসারণ করে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সড়ক ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

‘যানজট কমাতে সড়ক ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য ফুটপাত নিশ্চিত করা একটি আধুনিক শহরের মৌলিক দায়িত্ব,’ বলেন তিনি।

তবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ করে তাদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নাগরিক সেবা সহজ ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মীর নেওয়াজ বলেন, একটি সেবা পেতে নাগরিককে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়—এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার।

‘নাগরিককে একটি সেবা নিতে গিয়ে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে হবে—এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডিজিটাল সেবা বাড়াতে হবে এবং অভিযোগ জানানোর পর তার অগ্রগতি নাগরিক যেন জানতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে,’ বলেন তিনি।

তার মতে, জনপ্রতিনিধিত্ব শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়ার বিষয় নয়। নির্বাচিত হলে নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক মতবিনিময়, গণশুনানি এবং নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শোনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ।

তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আমাদের সম্পদ। উন্নয়ন করতে গিয়ে এই ঐতিহ্য নষ্ট করা যাবে না। বরং ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেই আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’

তার মতে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও এলাকাগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। 

সিটি করপোরেশন নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি নাগরিক সেবার বিষয়—এমন মন্তব্য করে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, নির্বাচিত হলে দল-মত নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য কাজ করতে চান।

‘রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু নির্বাচিত হলে দায়িত্ব হবে দল-মত নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য কাজ করা। জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানই জনপ্রতিনিধির প্রধান দায়িত্ব,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তই তার কাছে চূড়ান্ত।

‘দল যদি আমাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়, তাহলে এটি আমার জন্য দায়িত্ব ও আস্থার বিষয় হবে। দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও সেই সিদ্ধান্ত সম্মানের সঙ্গে মেনে নেব। বিএনপির রাজনীতিতে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়,’ বলেন তিনি।

মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। আমি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দলের সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব দিই। দল কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই আগে দেখব।’

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধী মত দমন ও বিভিন্ন অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

‘কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়, বরং আইন ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। রাজনীতিকে আরও সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও জনগণকেন্দ্রিক করতে হবে,’ বলেন তিনি।

তার মতে, রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জনগণের কাছে জবাবদিহির সংস্কৃতিও শক্তিশালী করতে হবে। ভবিষ্যতের রাজনীতিতে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

নিজের সম্ভাব্য নির্বাচনী অগ্রাধিকার তুলে ধরে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, ঢাকা দক্ষিণকে আরও বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণের মানুষকে এমন একটি নগর উপহার দিতে চাই, যেখানে নাগরিক সেবা পেতে হয়রানি কমবে, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা কমবে, পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে।’

তিনি বলেন, একটি কার্যকর সিটি করপোরেশন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেলে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে তাদের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।