রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে মঞ্জুর সরদার নামের এক ব্যক্তি সেদিন ফ্ল্যাটের ভেতরে কী ঘটেছিল, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন।
সোমবার (২১ মিনিটে) দুপুরে গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শ্যামনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মঞ্জুর সরদার জানান, রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আদালতে যাওয়ার জন্য এমপি গাজী নজরুল ইসলাম তাকে ফোন করে ডেকে নিয়েছিলেন। আদালতের কার্যক্রম শেষে বেলা তিনটার দিকে তারা আরও পাঁচ-ছয়জনসহ ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। সেখানে অতিথিকক্ষে তারা খাওয়া-দোয়া করলেও এমপি গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা কক্ষে খাবার খান।
মঞ্জুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পর গাজী নজরুল ইসলাম দ্রুত এসে তাকে ভেতরে যেতে বলেন। ভেতরে গিয়ে তারা দেখতে পান একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ এবং শত চেষ্টার পরও তা খোলা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে কক্ষটির পেছনের দিকে গিয়ে একটি জানালা খোলা দেখতে পান তারা। জানালার পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিলে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন মঞ্জুর। তিনি জানান, মরিয়মের গলায় ও ফ্যানের সঙ্গে কাপড়জাতীয় কিছু পেঁচানো ছিল এবং কক্ষের ভেতরে একটি চেয়ার ও প্লাস্টিকের টুল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
মরিয়ম জীবিত না মৃত, তা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দরজা বা জানালা না ভেঙে পুলিশ ও মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে জানানোর পর শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদের সেখান থেকে সরে যেতে বলে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীর এই বর্ণনা থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং বিস্তারিত তদন্তের পরই মৃত্যুর আসল কারণ ও এর সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে।
এদিকে নিহত মরিয়ম খাতুনের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ওবায়দুল্লাহকে (এমপির শ্যালক) দায়ী করে বলেছেন, ‘ও আমার মেয়েকে ঘর থেকে বাইরে বের করছে, ও সবকিছু করছে।’ বিয়ের পর মরিয়ম ওই ফ্ল্যাটেই বসবাস করতেন বলে জানান তার বাবা। তবে মেয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের সমস্যার কথা আগে জানানো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। পুলিশ তাকে কিছু চিঠি দেখালেও সেগুলোর হাতের লেখা তার মেয়ের কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। ওই মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোমবার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। পরে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
সেখানে স্থানীয় নাগরিক নেতা আসাদুজ্জামান মিটু, আবুল কালাম মড়ল, রেজাউল ইসলাম, আসিসুর রহমান ও নূরনগরের আবুল ইউসুফসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন। বক্তারা মরিয়মের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনানুগ বিচার এবং সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচনের দাবিও তোলেন তাঁরা। বিক্ষোভ শেষে উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।