এটি একটি ‘গুরুতর মানবিক সংকট’: রোহিঙ্গা ইস্যুতে ড. খলিলুর রহমান

জাতিগত দাঙ্গার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘গুরুতর মানবিক সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

সম্প্রতি জাতিসংঘের সংবাদমাধ্যম ইউএন নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা তুলে ধরে জানান যে, সহিংসতার মাধ্যমে এই সংকটের কোনো সমাধান সম্ভব নয়; বরং পারস্পরিক আলোচনা, সমঝোতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল এর দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার এক বছরের কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা পুনরুদ্ধার করা। রোহিঙ্গা সংকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে তিনি তার এই বৃহত্তর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। হাই-লেভেল উইক উপলক্ষে বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত ও দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছেন তিনি।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়কার লক্ষ্য ও আদর্শ স্মরণ করে তিনি উল্লেখ করেন যে, গত আট দশকে বড় ধরনের বৈশ্বিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হলেও বহু সংঘাত রোধ এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনে কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার—এই তিনটি প্রধান স্তম্ভেই সমানভাবে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

বর্তমান বিশ্বের নানামুখী পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন ড. খলিলুর রহমান। মানুষের সক্ষমতা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হলেও এআই মানবজাতির জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। উদ্ভাবনের গতি বজায় রাখার পাশাপাশি মানবতার কল্যাণে এই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

সাধারণ পরিষদের নৈতিক গুরুত্ব ও কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশকে একত্র করার ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের ভূমিকা অনন্য। প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে কূটনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি নিরাপদ পরিবেশ প্রদান এবং আন্তর্জাতিক নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণে এই সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

নিজের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উল্লেখ করেন, আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের মনে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার যে গভীর আকাক্ষা এবং টিকে থাকার সহনশীলতা তিনি দেখেছেন, তা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। সহিংসতার পথ পরিহার করে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই যে সব জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, সেই শিক্ষাই তিনি তাঁর বর্তমান সভাপতিত্বের কাজে প্রয়োগ করছেন।

পরিশেষে, তার এই এক বছরের মেয়াদের শেষে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয় সংস্কারে একমত করা, সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম ও সেবা পৌঁছানোর গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করতে চান ড. খলিলুর রহমান।