মানুষ এত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে কেন

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিচারহীনতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে মানুষ দিন দিন অনেক বেশি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। সমাজে সম্পদের সঠিক বণ্টন না থাকায় বৈষম্যের কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বেকারত্ব বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। অপরাধ করেও বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি সমাজে অপরাধপ্রবণতা ও ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া এর অন্যতম বড় কারণ। দ্রুতগতির আধুনিক জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত চাপ মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করছে বলেও বিশেষজ্ঞদের মত।

সর্বশেষ গতকাল সোমবার কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিজের মাকে কুপিয়ে এবং আছাড় দিয়ে আট মাস বয়সি ভাতিজিকে হত্যার অভিযোগে মো. ইমন (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন ইমনের মা পেয়ারা বেগম (৬৫) এবং তার ভাতিজি ইসরাত জাহান। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ইমনের ভাবি ও ইসরাতের মা রাবেয়া বেগম (৩৫)। দুই দিন আগে কুমিল্লায় একটি আইফোনের জন্য অপ্রতিম নামে ১৩ বছরের স্কুলছাত্রকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। খুলনায় ‘ভাত চুরির’ অপবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা। এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। এতে অসহিষ্ণুতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ইত্তেফাক বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য মানুষ নিজেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বা সহনশীলতা দেখানোর সময় বা মানসিকতা কোনোটাই অবশিষ্ট থাকছে না। এর ফলে তুচ্ছ ঘটনাতেও মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে। পাশাপাশি কিশোরদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস আসক্তিতে ধাবিত হচ্ছে। মাদকে আসক্ত তরুণ বা ব্যক্তি নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। ফলে শুরু হচ্ছে সংঘাত, সহিংসতা ও নানা ধরনের সামাজিক অস্থিরতামূলক ঘটনা।’

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে মানুষের চরম অসহিষ্ণুতা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি, পারিবারিক কলহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিদ্বেষ প্রকাশ এবং হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র। মানুষ তার স্বাভাবিক সহনশীলতা হারিয়ে এক চরম মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টিকে থাকার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা মানুষকে স্বার্থপর ও উগ্র করে তুলছে। 

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘যৌথ পরিবার প্রথা বিলুপ্ত হওয়া, কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির যত্রতত্র ব্যবহার মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। মানুষ ‘সমঝোতা’ শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা করে দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। আগের মতো সহমর্মিতা বা আপস করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে না। ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফরমগুলো ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়ানোর গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই মানুষ তাত্ক্ষণিক ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে মানসিক চাপ কমানোর তো কোনো ব্যবস্থা নেই।’

তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে পারিবারিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এমনকি বিয়েবাড়িতে মাংস কম দেওয়া বা রাস্তায় সামান্য ধাক্কা লাগার মতো তুচ্ছ ঘটনাতেও মানুষ খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, বিষণ্নতা এবং তীব্র মানসিক অবসাদ মানুষের আচরণকে আক্রমণাত্মক করে তোলে। বাংলাদেশে প্রায় ১৮-২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যা সরাসরি তাদের আচরণগত সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) তথ্য মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, গুজব ও ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর হার প্রতিবছর বাড়ছে, যা মাঠপর্যায়ে সরাসরি সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার সাভারের আমিন বাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় মো. ইসমাইল (৫০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়। পরে পুলিশ জানায়, ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের একটি বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার ইসমাইলের কাছে থাকা টাকার কথা জানতে পেরে তাকে বাসের ভেতরে হাত-মুখ স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ও গলায় টাওয়েল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মরদেহটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে পালিয়ে যায়। গত ২৯ আগস্ট সকালে ‎জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে মারা গেছেন বগুড়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৫)।

এদিকে, গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শাহিনুর বেগম (৩৮) ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয়রা পিটুনি দিলে পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ২২ আগস্ট রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ব্যস্ত সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা আবাসিক এলাকায় এমনকি নিজ ঘরেও নিরাপদ বোধ করছে না দেশের সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে টার্গেট কিলিং, চুরি, ধর্ষণ, সাইবার ক্রাইম, মারামারি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা যেন প্রতিদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই আসামির বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হচ্ছে। সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিন ধরে পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সি এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার প্রধান আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, দুই তলা বাড়িটির মালামাল ভাঙচুর করে। তারা বাড়িটির দরজা ও জানালা খুলে ফেলে। বড় হাতুড়ি দিয়ে ছাদ ভাঙতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে বাড়িটির অবকাঠামোর অনেকাংশই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে আগে থেকে পুলিশ মোতায়েন ছিল, তবে গ্রামবাসীর তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় সে সময় বাধা দেওয়া যায়নি।