ঢাকাকে সবুজ চাদরে জড়িয়ে দিতে গ্রিন সেভার্স

একসময় উদ্ভিদকে আর দশটা জড়বস্তুর মতোই ভাবা হতো। উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বিস্ময়কর আবিষ্কারের আগে সে কথা জানত না কেউ। বলা হয়, গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান। কেউ বলেন, সবুজ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, বিভিন্ন অনুষ্ঠান-সেমিনার ও বইয়ের পাতায় এসব কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই সচেতনতায় ঘাটতি আছে। ফলে চারপাশে বৃক্ষনিধনের মহোত্সব চোখে পড়ে। মানুষের মাঝে বৃক্ষরোপণের ব্যাপারে সচেতনতা, গাছের যত্ন ও খুব স্বল্প খরচে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গাছের পরিচর্যার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে গ্রিন সেভার্স নামের একটি সংগঠন। শুধু তাই নয়, তাদের লক্ষ্য ঢাকাকে সবুজের আচ্ছাদনে সাজিয়ে একটি আদর্শ ও পরিবেশবান্ধব নগরে পরিণত করা।

গাছ যে শুধু খোলা মাঠে কিংবা রাস্তার পাশের জমিতেই লাগাতে হবে, এমনটা নয়। বাড়ির ছাদে, এমনকি ছোট বারান্দায়ও হতে পারে সবুজের বাগান। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আহসান রনি। জামালপুরের এই তরুণের সঙ্গে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এখন পর্যন্ত সদস্য সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। আরো একটি বিশেষত্ব হলো, এই শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই কৃষকের সন্তান। ক্ষেতখামারে খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানেরা সবুজের আবেদনটা উপলব্ধি করেন। ভালোবেসে কাজ করেন গাছের ডাক্তার হয়ে।

ফেলনা বোতল, পুরনো টায়ার, প্লাস্টিকের জার, পাতিল, বাটির মতো যেকোনো জিনিসকেই টব বানাতে পারেন। বাগান করেছেন, রক্ষণাবেক্ষণে পরামর্শ দরকার? অথবা আপনার লাগানো কোনো গাছের অসুখ বা পোকার আক্রমণ হয়েছে? গ্রিন সেভার্সের গাছের ডাক্তারকে ডাকুন। সাইকেলে করে গাছ পরিচর্যার বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে গাছের পরিচর্যা করেন এই গাছের ডাক্তাররা। বিনিময়ে অল্প কিছু টাকা তাদের ‘ভিজিট’ দিতে হয়। আবার অ্যাম্বুলেন্স সেবাও রয়েছে। আক্রান্ত গাছকে হাসপাতালে এনে চিকিত্সা করা যায় এর মাধ্যমে! আহসান রনি বললেন, ‘আমরা এদেরকে মালী বলি না, গাছের ডাক্তার বা বাগান সেবক বলি। কারণ, আমরা এই পেশাটিকে জনপ্রিয় করতে চাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ যাতে আস্থা পায় ও তরুণরা যাতে এই পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ হয় সে জন্যই তাদের ‘গাছের ডাক্তার’ পদবি দেওয়া হয়েছে। এই নামে ডাকলে কেউ তাদের অবজ্ঞা করে না। এছাড়া পেশাটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে গ্রিন সেভার্স।’

সবুজ নিয়ে কাজে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পেছনে একটা গল্প আছে, জানালেন আহসান রনি। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তখন একদিন টিউশন পড়াতে গিয়ে জানলেন তার ছাত্রের শখ গেম খেলা। প্রকৃতির পরিচর্যার কথা একদমই না ভেবে এই প্রজন্ম কেবল গেম ও প্রযুক্তির আকর্ষণে বড়ো হচ্ছে—এমনটা তিনি সবসময় ভাবতেন। ফলে ভাবলেন এমন একটা কাজ করবেন, যা ছোটদের ভবিষ্যতে প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্বে সচেতন করতে পারে। এরপর গ্রিন সেভার্সের জন্ম বছর কয়েক আগে। ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জমানো অর্থেই বাগান করার একটা ব্যবস্থা চালু করেছেন। অক্সিজেন ব্যাংক নামে একটা বাক্স রাখছেন, এতে শিক্ষার্থীরা এক টাকা দু টাকার কয়েন জমাচ্ছে। সেই টাকায় কেনা হচ্ছে গাছের চারা। ভ্রাম্যমাণ নার্সারি ও ক্লিনিক নিয়ে একেক দিন একেক এলাকায় গিয়ে গাছ সরবরাহ ও গাছের সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ‘কৃষি পড়ি, দেশ গড়ি’ এই স্লোগান নিয়ে ‘কৃষিপাঠ’ নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি। কৃষকের সন্তানদের কৃষিবিষয়ক আধুনিক ধারণা দেওয়া হচ্ছে, যেন তারা তাদের মা-বাবাকে আধুনিক কৃষির তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। কৃষিবিদদের সঙ্গে কৃষকের দূরত্ব কমানোর জন্য এবং গ্রামপর্যায়ে আধুনিক কৃষির ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া এ কার্যক্রমের লক্ষ্য।

গাছ লাগাবে শিশুরা, পরিচর্যাও করবে তারাই; এমন ধারণায় ‘সবুজ আগামীর স্বপ্ন নিয়ে’ প্রতিপাদ্যে বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে কর্মশালাও করছেন তারা। শিশুদের উত্সাহ দিতে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলায় এই কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মাননাসহ বেশকিছু পুরস্কার যোগ হয়েছে ঝুলিতে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের পাশেই গ্রিন সেভার্সের কার্যালয়, সেখানেই চালু আছে গাছের হাসপাতাল।