ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বিধান অনুযায়ী, চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার এবং সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ১০ লাখ এবং সদস্য প্রার্থীর ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থীর হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা ইউপি নির্বাচন বিধিমালা (সংশোধনী) প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীকে ২৫ হাজার টাকা এবং সদস্য পদে প্রার্থীকে ৫ হাজার টাকা ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুকূলে জমা দিতে হবে। কোনো প্রার্থীর পক্ষে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করা হলেও একাধিক জামানত দিতে হবে না।
জামানত ফেরতের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ পেলে তার জামানত ফেরত দেওয়া হবে। এর কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। তবে জামানত ফেরত পাওয়ার যোগ্য কোনো প্রার্থী সরকারি গেজেটে নির্বাচনের ফল প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে অর্থ গ্রহণ না করলে তা অফেরতযোগ্য হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আগে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হতো।
বিগত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী হলফনামা দাখিলের বিধান ছিল না। নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবে সদস্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে হলফনামা দেওয়ার বিধান রাখা হয়নি।
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ইসির ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টের বিরুদ্ধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। এ আদেশ সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে।
কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে কমিশন ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে। অনুসন্ধানের পর প্রয়োজন মনে করলে কেন্দ্রটির নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশও দিতে পারবে।
সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয় ১০ লাখ এবং সদস্য প্রার্থীর ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যয়সীমা ছিল ৫ লাখ এবং সদস্য প্রার্থীর ১ লাখ টাকা।
নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রচারণার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬-এর বিধান প্রযোজ্য হবে। ওই বিধিমালার পরিপন্থী কোনো কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব পরিচালনার জন্য তফসিলি ব্যাংকে আলাদা হিসাব খোলার বিধান রাখা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়ের সব অর্থ ওই হিসাব থেকে ব্যয় করতে হবে। কোনো খাতে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি ব্যয় হলে তা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির পরিবর্তে পুনরায় ভোট গ্রহণের বিধান করা হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমান সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোট গ্রহণের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেবে কমিশন।
দৃষ্টি বা শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কিংবা অন্য কোনো কারণে সহায়তা প্রয়োজন এমন ভোটারকে ভোটদানে সহায়তার জন্য কমপক্ষে ২১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
ভোটার নিজে ব্যালট পেপারে চিহ্ন দিতে না পারলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তাকারী চিহ্ন দিতে পারবেন। তবে সহায়তাকারী কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর এজেন্ট, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হতে পারবেন না। তাকে ভোটারের পছন্দ গোপন রাখার নির্দেশনাও দিতে হবে। এ ধরনের ভোটারের তালিকা সংরক্ষণ করবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী বা পর্যবেক্ষককে হুমকি, ভয়ভীতি, আঘাত বা বলপ্রয়োগ করে বাধা দেওয়া কিংবা তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে বিরত রাখা বা মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করাও অপরাধ।
এসব অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো মনিটরিং করতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠন করতে পারবে কমিশন।
কোনো প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট বা পোলিং এজেন্ট নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না থাকলেও তাদের অনুপস্থিতির কারণে আইনানুগভাবে সম্পন্ন কোনো কার্যক্রম অবৈধ হবে না। তবে রিটার্নিং বা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে এবং অনুপস্থিতির কারণ লিখিতভাবে কমিশনকে জানাতে হবে।
আসন্ন ইউপি নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হবে। চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০টি, সাধারণ সদস্য পদের জন্য ১২টি এবং সংরক্ষিত সদস্য পদের জন্য ১০টি প্রতীক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।