সরকার বিরোধী দলের কথা না শুনলে আন্দোলন চলবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমেই এর ফয়সালা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এমপি। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর মগবাজারস্থ আলফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় নেতা জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটকে উপেক্ষা করার নেতিবাচক প্রভাব, দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, জনদুর্ভোগ, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস-সংকট, গার্মেন্টস শিল্প, বিরোধী দলের চলমান লংমার্চ কর্মসূচি এবং সাংবাদিকদের পেশা ও ব্যক্তিগত বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বিভিন্ন সমস্যা জানতে চান। সমস্যা সমাধানে কোনো ইউনিয়ন বা কাঠামো থাকলে তার মাধ্যমে প্রস্তাবনা ও সমস্যার বিষয়ে জানালে তা সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি। মিডিয়াকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী চতুর্থ স্তম্ভ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে।’ তিনি গণমাধ্যমকে কালোকে কালো ও সাদাকে সাদা বলার আহ্বান জানান।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে। দেশীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। সমাজে এর সর্বগ্রাসী প্রভাব রয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী বিষয় নিয়ে তারা কথা বলছেন।’ তিনি সাংবাদিকদেরও এসব বিষয়ে কথা বলার আহ্বান জানান।
সরকারি দলের তরফ থেকে লংমার্চের সমালোচনার জবাবে বিরাধীদলীয় এই নেতা বলেন, চাইলে পাঁচ হাজার গাড়ি নিয়েও লংমার্চ করতে পারতেন। লংমার্চের দাবিগুলো একক কোনো দলের নয়; এগুলো জনগণের দাবি। ঢাকা-রংপুর লংমার্চের আগে ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে সরকারি দলের বক্তব্যকে পাগলের প্রলাপ বলে উল্লেখ করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। লংমার্চে স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোতে দিশেহারা হয়ে সরকারি দলই বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ লংমার্চ বানচাল করার হীন উদ্দেশ্যে ককটেল ফুটিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জামায়াত কেন এটা করতে যাবে? সে কি নিজে নিজের কর্মসূচি বানচাল করতে চাইবে? বরঞ্চ যদি আমাদের কর্মসূচিটাই বানচাল করার জন্য কেউ এ ধরনের প্যানিক সিচুয়েশন তৈরি করে থাকে, এই দায় তাদের।’
মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। সভায় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আব্দুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি; কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান ও অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন।
পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কোনো কোনো মহল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর চিন্তা করছে দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, ‘এটা অন্যায় সিদ্ধান্ত হবে। জামায়াত এটা চায় না। টাকা রোজগার করতে বিরোধী দল সংসদে যায়নি। সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে বিরোধী দল তাতে বাধা দেবে।’ সরকার এক বছরের মধ্যে এক-দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলেছিল, কিন্তু এখন অনেকে কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আলোচনা আসছে না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলের দেওয়া নোটিশ নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি, সার, বিদ্যুত্, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশুধর্ষণ ও হত্যা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা দফায় দফায় নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু সব নোটিশ আলোচনায় আনা হচ্ছে না।’ জামায়াতের জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও নোটিশকে সরকার গুরুত্ব না দেওয়ায় বিরোধী দল রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে বলে জানান শফিকুর রহমান।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, ‘প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার তেল ব্যবহার হয়। মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে কোটি কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে যাবে।’ সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের অর্থনীতির সামঞ্জস্য ঐসব দেশের অর্থনীতির সঙ্গে না থাকে, তাহলে শুধু জ্বালানির বিষয়ে কেন তুলনা করবেন?’ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তিন দফায় জ্বালানি তেলের (ডিজেল দুবার, পেট্রোল ও অকটেন তিন বার) দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘দাম বাড়িয়ে বলা হয় সহনীয় মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে। যিনি দাম বাড়িয়েছেন তার জন্য এটি সহনীয় হতে পারে, কিন্তু বাইকচালক, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না। মিসলিড করা হয়। কাটপিস, লেজ নাই, মাথা নাই, মাঝখান থেকে পেট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এটার মাধ্যমে মানুষ কনফিউজড হয়।...যদি আমরা এ নিশ্চয়তা পাই যে এগুলো হবে না, তাহলে আমরা কথা ইনশা আল্লাহ বলব। নির্বাচনের পরে এখন পর্যন্ত সরকারি খরচে বিদেশ সফরে যাননি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘তিনি সরকারি খরচে হাত দিতে চান না। মাসিক যে ভাতা পান, তাও অন্য খাতে দিয়ে দেন, নিজে নেন না। নিজের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাসা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান জানান, সেখানে বিভিন্ন কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। তবে সেখানে তিনি থাকেন না।