রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে এক তরুণীকে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে মারধর ও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় আহত তরুণী সুমাইয়া রহমান খিলগাঁও থানায় অভিযোগ করেছেন। তিনি জানান, তার মুখ, চোখের নিচে, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে।
গতকাল রাতে সংবাদমাধ্যমে সুমাইয়া বলেন,মাইনুলের ভাই বারবার উদ্ধত ভঙ্গিতে আমার দিকে তেড়ে আসছিলেন। মারধরের কারণে চোখের নিচে নীলচে হয়ে গেছে। সেটা দেখিয়ে আমাকে নিয়ে মন্তব্য করতে থাকেন। এরপরও তারা নানা বাজে শব্দ ব্যবহার করেন। আমি খুবই আতঙ্কে আছি। যেভাবে তারা হামলা করেছে, আমাকে মেরে ফেলতেও তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না।
সুমাইয়া জানান, ২২ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১০টার দিকে তিনি বনশ্রীর এফ ব্লকের ৮/৩ নম্বর সড়কের লাল মিয়া গলিতে কয়েকটি পথকুকুরকে খাবার দিতে যান। তিনি নিয়মিত ওই এলাকায় কুকুরদের খাবার দেন। একটি কাপড়ের দোকানের সামনে কুকুরগুলোকে খাবার দিচ্ছিলেন। এ সময় কুকুরগুলো কয়েকটি দোকানের সিঁড়িতে উঠে গেলে ১০-১২ বছর বয়সী এক কিশোর তাকে সরে যেতে বলে। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং ওই কিশোর তাকে গালাগাল করে। সুমাইয়া তাকে বেয়াদবি না করার কথা বললে দোকানের ভেতর থেকে ২০-২২ বছর বয়সী এক তরুণ বেরিয়ে এসে তার মুখে ঘুষি মারেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সুমাইয়ার দাবি, এরপর ওই তরুণ আশপাশের লোকজনকে ডেকে আনেন। প্রায় ৫০-৬০ জন লোক জড়ো হয়। তাদের কেউ তাকে মারধর করেন, কেউ গালাগাল ও হেনস্তা করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এ ঘটনা চলে।
সুমাইয়ার সঙ্গে থাকা আসিফ ইমতিয়াজও ওই এলাকায় পথকুকুরকে খাবার দেন। তিনি বলেন, দোকানের সামনে থেকে সরে যেতে বলা হলে তারা শুরুতে দুই মিনিটের মধ্যে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং সুমাইয়াকে মারধর করা হয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আসিফ সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি সুমাইয়াকে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
পরদিন সকালে সুমাইয়া মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তিনি জানান, চোয়ালে সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসক তাকে এক্স-রে করতে বলেন। সুমাইয়া বলেন, ‘তারা আমাকে খুব বাজেভাবে আঘাত করেছে। সবচেয়ে বেশি মেরেছে পিঠে। প্রাণ বাঁচাতে কোনো রকমে আমি ওই এলাকা থেকে পালিয়ে আসি।’
চিকিৎসা নেওয়ার পর সুমাইয়া খিলগাঁও থানায় অভিযোগ করেন। গতকাল বিকেলে পুলিশ তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য লাল মিয়া গলিতে যায়। পুলিশের সঙ্গে সেখানে যাওয়ার সময় মাইনুল, তার ভাই ও স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন সুমাইয়া। তিনি বলেন, মাইনুলের ভাই বারবার আগ্রাসী ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে আসেন এবং ঘটনা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করতে থাকেন। হামলার শিকার হওয়ার পরও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় তিনি আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
ঘটনাস্থলে স্থানীয় কয়েকজন বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় বাসিন্দা নূর হোসেন একজন নারীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, কুকুরকে খাবার দেওয়ার কারণে দোকানের জায়গা নোংরা হয়ে যাওয়ায় দোকানের কর্মীরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে সুমাইয়ার সঙ্গে দোকানের মালিকের তর্ক হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সুমাইয়াকে প্রথম আঘাত করা ব্যক্তির নাম শুভ বলে দাবি করেন। তার দাবি, শুভ স্থানীয় বিএনপি নেতা মাইনুল ও হালিমের সহযোগী এবং পরে তিনিই ঘটনাস্থলে আরও লোকজনকে ডেকে আনেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী সুমাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আজহারুল ইসলাম। তিনি জানান, সুমাইয়ার ওপর হামলার বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত হলেও কারা এ ঘটনায় জড়িত তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। তদন্তের স্বার্থে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হলেও এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি; তবে অপরাধীদের শনাক্তে কাজ চলছে।