জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইড ইভেন্ট হিসেবে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘ইউনাইটেড ফর ওয়াটার: আ কল ফর কালেক্টিভ অ্যাকশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতার ওপর জোর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব স্থায়ী মিশন আয়োজিত এই বৈঠকে তিনি পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিন্ন পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শুরুতেই ড. সাইমুম পারভেজ পানি ও মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, “পানি আমাদের সংযুক্ত করে। এটি মানুষ, অর্থনীতি ও প্রতিবেশব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে। পানি সীমান্ত অতিক্রম করে এবং আমাদের অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে।”
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং মিঠাপানির ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণে শুধু জাতীয় সীমানার মধ্যে থেকে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আবু ধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য ইউএন ওয়াটার কনফারেন্সের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি অঙ্গীকারকে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য কার্যক্রমে রূপান্তরের আহ্বান জানান, “আমাদের কাজ হলো অঙ্গীকারকে এমন সহযোগিতায় রূপান্তর করা, যা পরিমাপযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত করবে।”
আন্তর্জাতিক পানি সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অভিন্ন নদী ও ভূগর্ভস্থ জলাধারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, নিয়মিত সংলাপ, সময়োপযোগী তথ্য বিনিময় এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত। সর্বোপরি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা।” জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানিপ্রবাহ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি সহযোগিতামূলক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বাস্তব সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, “উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন, উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং সহনশীল পানি অবকাঠামো ও সেবা গড়ে তোলার সক্ষমতা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ ও নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ একই সঙ্গে বন্যা ও পানির সংকট, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং উপকূলীয় লবণাক্ততার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তিনি নদী, খাল ও নিষ্কাশনব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, বন্যা ব্যবস্থাপনা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণসহ বাংলাদেশের চলমান উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি পানি ও পরিবেশগত সহনশীলতাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর সরকারের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য ও টেকসই ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশ নদীতীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ, অভিন্ন পানিসম্পদের ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় এবং আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের আহ্বান জানায়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৯২ সালের ইউএন ওয়াটার কনভেনশনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক পানি সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, “একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে এবং জ্ঞান, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সমন্বয়ে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।” সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন, “আসুন, অভিন্ন পানির চ্যালেঞ্জকে অভিন্ন অগ্রগতিতে রূপান্তর করি।”