যশোর-ঝিনাইদহ ছয় লেন মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় দফায় কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাস সময় বাকি আছে। ছয় বছর ধরে চলা এই কাজ যশোর অংশে মাত্র আড়াই শতাংশ এবং ঝিনাইদহ অংশে মাত্র ১১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আর তা প্রধানত জমি অধিগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জমি অধিগ্রহণও বাকি রয়েছে ১৫ শতাংশ। এর বাইরে সরকারি নানা স্থাপনা সরানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে। সব মিলিয়ে নতুন করে আরো তিন থেকে চার বছর সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, চারটি প্রধান লেন ও দুটি সার্ভিস লেনসহ মোট ছয় লেনে সড়কটি উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৮৭ কোটি এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার সড়কের হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে প্রাথমিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সংশোধিত ব্যয়ে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি তিনটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জমি অধিগ্রহণের ঝামেলায় অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। আমরা এ পর্যন্ত ৮৫ ভাগ জমি পেয়েছি বলে এখন থেকে কাজ দৃশ্যমান হতে থাকবে।
—সাদিকুল ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক
২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্পের কাজ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। কিন্তু চার মাস সময়ে ৮৭ শতাংশ কাজ আদৌ শেষ করা সম্ভব না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম প্যাকেজে অগ্রগতি প্রায় ১১ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজে কাজের অগ্রগতি প্রায় আড়াই শতাংশ। জমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কারণে এসব এলাকায় কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ডেপুটি প্রকল্প ম্যানেজার প্রকৌশলী আল মামুন মিয়া বলেন, গত ১৭ সেপ্টেম্বর যশোরের জেলা প্রশাসক ৫৩.৮৯ একর জমি হস্তান্তর করেছেন। আরো ৬ একর জমি অধিগ্রহণ বাকি আছে। পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকোর বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তর, স্থাপনা, গাছ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের সমস্যাগুলো সমাধান হলে কাজের গতি আরো বাড়বে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের হিসাবে অধিগ্রহণের ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ হলেও নির্মাণকাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ফলে কোন অংশে কত জমি অধিগ্রহণ বাকি, কত অর্থ পরিশোধ হয়েছে এবং অর্থ পরিশোধের বিপরীতে কতটুকু জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার প্যাকেজভিত্তিক হিসাব নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও সড়কের অংশবিশেষ খুঁড়ে রাখা হয়েছে। আবার মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ইটের সোলিং করা হয়েছে। ফলে বিদ্যমান সড়ক দিয়েই ভারী যানবাহন চলাচল করছে। এতে বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ ও উঁচুনিচু অবস্থা তৈরি হয়েছে।
কাজের শ্লথগতি প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আবদুল মোনায়েম লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মঞ্জুর হাসান বলেন, জমির কাগজপত্র বুঝে পেয়েছি ২২ সেপ্টেম্বর। এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এগুলো পেলে কাজের গতি আসবে।
প্রকল্পের তিনটি লটেরই প্রকল্প ব্যবস্থাপক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, জমি অধিগ্রহণ পেতে অনেক সময় লেগে গেছে বলেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান সড়ক চালু রেখে চার লেনে উন্নীতকরণের বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বর্ষা মওসুম শেষ হলেই পুরোমাত্রায় কাজ শুরু করা যাবে। এজন্য অবশ্য প্রকল্প মেয়াদও চার বছর বাড়াতে হবে।
প্রকল্প পরিচালক সাদিকুল ইসলাম মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, জমি অধিগ্রহণের ঝামেলায় অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। আমরা এ পর্যন্ত ৮৫ ভাগ জমি পেয়েছি বলে এখন থেকে কাজ দৃশ্যমান হতে থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময়সীমা বাড়লেই ব্যয় বাড়বে, এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।