জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঝাঁজালো ভাষণ থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বহুল আলোচিত বৈঠক—কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের একক প্রভাব ও শক্তি আবারও জানান দিতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এক সপ্তাহের এই টানা দৌড়ঝাঁপ দেশ-বিদেশে ট্রাম্পের সামনে থাকা বহুমুখী সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
ইরানের সঙ্গে বিস্তৃত হতে থাকা যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং কমছে খোদ ট্রাম্পের নিজস্ব জনপ্রিয়তাই। একই সঙ্গে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) খাতে চীনের আধিপত্যের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যন্ত নানা ইস্যুতে মিত্রদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সমর্থন না পেয়ে বাধার মুখে পড়েছেন তিনি। ফলে ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি কার্যত থমকে গেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিসরকে আরও সংকুচিত করে তুলছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক শৃঙ্খলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইরানকে চুক্তিতে না এলে নিশ্চিহ্ন করার কড়া হুমকি দেন ট্রাম্প। পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মালের অধিকার পায়।’ এর পরপরই হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মুখোমুখি হন তিনি।
তবে রাজকীয় আয়োজনের বিপরীতে এই শীর্ষ বৈঠকের অর্জন ছিল খুবই সীমিত। এআই, বাণিজ্য ও ইরানের মতো জটিল দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোতে কোনো স্পষ্ট অগ্রগতির দেখা মেলেনি; কেবল দুই দেশের বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো ছাড়া। বিশেষ করে স্বশাসিত তাইওয়ান ইস্যুতে অতীতের মতো চড়া সুর না দেখিয়ে ট্রাম্পের নমনীয় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। প্রযুক্তিপণ্যের অন্যতম কাঁচামাল বিরল খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহে চীনের আধিপত্য থাকায় ট্রাম্পের শুল্কনীতির হুমকি কার্যত বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান এবং সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ব্রেট ব্রুয়েন এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, ট্রাম্প এমন এক বিশ্বে ফিরিয়ে নিতে চাইছেন যেখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি চলে। অথচ শক্তিশালী সি চিন পিংয়ের সামনে এলেই তাঁর সেই কঠোর অবস্থান পুরোপুরি নরম হয়ে যায়।
অন্যদিকে জাতিসংঘ মঞ্চে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’ এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী বলে দাবি করলেও প্রায় সাত মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে শুরু করা এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক ধাক্কায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়েছে। কিন্তু তীব্র ক্ষতির মুখেও তেহরান পিছু না হটে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক মিত্র দেশই কোনো আগাম আলোচনা ছাড়াই শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে সামরিক সহায়তা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্যেও ট্রাম্পের এই বলপ্রয়োগের রাজনীতির বিরুদ্ধে বার্তা উঠে এসেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিশ্বে ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্তি ও জবরদস্তির বিপরীতে সভ্য সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একইভাবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিরাগত প্রভাবের কড়া সমালোচনা করেন।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা চীন নয়, ইউক্রেন-রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় সীমিত যুদ্ধবিরতি টানা কিংবা গ্রিনল্যান্ডে প্রভাব বিস্তারের মতো ইস্যুতেও তাঁর নীতি বারবার হোঁচট খেয়েছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমারের মতে, এক বছর আগেও যেখানে ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে বহু দেশ দ্বিধায় ছিল, আজ কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ অনেকেই সরাসরি ‘না’ বলার আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে। খোদ ট্রাম্পও যেন নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান; জাতিসংঘে এআই নিয়ে কথা বলার ফাঁকে তিনি নিজেই মন্তব্য করে বসেন, ‘দেখা যাক আমার আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কি না!’