ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ‘অর্গানিক’, সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে: রিয়াজ হামিদুল্লাহ

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে ‘অর্গানিক’ এবং পারস্পরিক নির্ভরতা ও অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের বিদায়ী হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগ ও সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে  তিনি বলেন, ‘খুবই সহজভাবে বললে এটি এমন একটি সম্পর্ক, যেটিকে আমি বিভিন্ন সময়ে অর্গানিক সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছি... পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক। এটি অভিন্ন স্বার্থের সম্পর্ক।’

২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ। আগামী মাসের শুরুতে তিনি নয়াদিল্লি ছাড়বেন। এরপর জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)।

রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ঘনিষ্ঠ যেকোনো সম্পর্কের মতোই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে ঘনিষ্ঠ দুটি দেশের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য থাকতেই পারে।

তবে এসব পার্থক্য সত্ত্বেও দুই দেশকে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিধি বর্তমানের তুলনায় আরও অনেক বাড়ানো প্রয়োজন।

জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ

রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ প্রচলিত আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এতে লাখো-কোটি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হতে পারে এবং দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি অনালোচিত ক্ষেত্র, যেটি এখনো পড়ে আছে।’

মন্ত্রণালয় ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি উদাহরণ হিসেবে শিক্ষার্থী, স্কুলপড়ুয়া শিশু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেন। তার মতে, এসব ক্ষেত্রে বৃহত্তর যোগাযোগ ‘লাখো’ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।

সম্প্রতি ভারতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রিয়াজ হামিদুল্লাহ তার ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে কাশ্মীরের দিল্লি পাবলিক স্কুল (ডিপিএস) শ্রীনগর সফরের কথা উল্লেখ করেন। ৩ সেপ্টেম্বর শ্রীনগরে পৌঁছানোর পর তিনি স্কুলটি পরিদর্শন করেন। সেখানে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক ও শিক্ষামুখী পরিবেশ তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে বলে জানান তিনি।

ডিপিএস শ্রীনগর ২০০৩ সালে ডি পি ধর মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে বিজয় কে ধরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ও শুরুর দিকের সময়ে প্রয়াত ডি পি ধর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, স্কুলটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার কথোপকথন সীমান্ত ও পরিচয়ের মতো বিষয়গুলোকে তরুণরা কীভাবে দেখে, সে বিষয়ে তাকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। 

স্কুলটির দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরজে ফাতিমা নিজেকে একজন রেডিও জকি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে স্কুলের ডিজিটাল রেডিও স্টেশনে আমন্ত্রণ জানান। ২০১৯ সাল থেকে স্টেশনটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান হাইকমিশনার।

রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ‘সে শুধু আমাকে আমন্ত্রণ জানাল এবং রেডিও স্টুডিওতে নিয়ে গেল। সেখানে আমাদের কথোপকথন শুরু হয়।’

ফাতিমার একটি প্রশ্ন তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল বলে জানান তিনি। প্রশ্নটি ছিল, ‘আপনি সীমান্তকে কীভাবে দেখেন?’

রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ‘ভাবুন, শ্রীনগরে বসে একটি মেয়ে এমন প্রশ্ন করছে।’ তিনি জানান, প্রশ্নটি তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে নিয়েছেন এবং সেভাবেই তার উত্তর দিয়েছেন।

জনগণের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এসব বিষয় আটকে রাখা উচিত নয়।

চলতি মাসের শুরুতে ঢাকায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, দুই দেশ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে। তবে মৈত্রী এক্সপ্রেস, গঙ্গা পানি চুক্তি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো বিষয়গুলো আটকে রাখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘এগুলো সাধারণ মানুষের বিষয়।’ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে কেন্দ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, উভয় দেশের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে, এতে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে।

এর আগে মঙ্গলবার ভারতও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখীভাবে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করে। নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, বিদ্যমান কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ নিয়ে উৎসব

শনিবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশকে ঘিরে ‘ইলিশ ফেস্ট’ আয়োজন করা হয়।

হাইকমিশনের ‘মৈত্রী’ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিক, কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বরা ঢাকায় প্রকাশিত ‘এ ফিশ কলড ইলিশ’ বইটি উন্মোচন করেন।

বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রান্নার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ইলিশকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আতিথেয়তাও তুলে ধরা হয়। অতিথিরা বিভিন্ন ধরনের ইলিশের পদসহ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেন।

অতিথিরা বাংলাদেশের ইলিশের স্বাদের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধেরও প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিশিষ্ট সাংবাদিক এম জে আকবর, সাবেক কূটনীতিক ও রাজনীতিক মণিশঙ্কর আইয়ার, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজচিন্তক সৈয়দা হামিদ, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রোনেন সেন এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অতিথিরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদারে ভূমিকা রাখবে।

বই উন্মোচনের পর বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও মাছটি গভীরভাবে সম্পর্কিত।

তিনি জানান, বাংলাদেশে ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম রয়েছে। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ ইলিশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।