সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আবারও আহ্বান জানিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিরোধী দল কমিটির আলোচনায় অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব ও মতামতও সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।
আজ জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, কমিটির সদস্য সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত, প্রস্তাব ও পরামর্শ দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা বারবারই বিরোধী দলকে আহ্বান জানিয়েছি। এখনো আহ্বান জানাই- তারা যখনই এই কমিটিতে যোগদান করবেন, আমরা স্বাগত জানাব। তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।’
তিনি বলেন, আলোচনায় অংশ নিলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়ও ধারণ করা ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে। সরকার চায় সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে বিভক্তি না রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজটি সম্পন্ন করতে।
সংবিধান সংশোধনের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির রিপোর্ট জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এরপর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিল আসবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনেই বিলটি আসতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার লক্ষ্য কমিটি আগেই জানিয়েছিল।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রথমে সংসদে বিল উত্থাপন হবে। বিলের ওপর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও বিরোধিতার বিষয়গুলো নিষ্পত্তির পর সংসদীয় বিধি অনুযায়ী সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর যেসব সাংবিধানিক বিধানের সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবিধানিক গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ গণভোট এবং সাংবিধানিক গণভোট এক বিষয় নয়। সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ ধরনের গণভোটের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আগে সংসদে সংশোধনী পাস হবে। এরপর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের জন্য গণভোটের বিধান রয়েছে, সেগুলোতে গণভোট হবে। জনগণ পক্ষে ভোট দিলে এরপর রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করবেন।’
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয়ে সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান কার্যকর হতে পারে। তবে কোন কোন অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হবে, তা কমিটির আলোচনা ও পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে।
কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকুক, কোনো বিভক্তি না থাকুক। জুলাই জাতীয় সনদ সম্পূর্ণরূপে যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করব। এর বাইরেও কিছু বিষয় আছে, যেগুলো ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি বা পরিহার করা হয়েছে। সেগুলোও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই।’
তিনি জানান, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও জনসেন্টিমেন্ট থেকে সংবিধানে ধারণযোগ্য বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে। আর যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলো আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই করা হবে।
সাংবাদিকদের মতামত প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজকের সভায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকে লিখিত আকারেও তাদের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব লিখিত প্রস্তাব কমিটি গ্রহণ করে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়েও সাংবাদিকরা বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এসব মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন ও পুস্তিকা প্রণয়ন করা হবে। তবে বিশেষ কমিটির মূল রিপোর্ট পৃথকভাবে থাকবে।
কমিটির সভাপতি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদই তাদের কাজের প্রধান ভিত্তি। তবে নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ প্রণয়নের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রায়োরিটি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে যেসব বিষয়ে আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি, সেগুলোও ধারণ করব।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টিও তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না এলেও তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার রয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ প্রণয়নের সময় বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু কমিটির পক্ষ থেকে নয়, সাংবাদিকদের মাধ্যমেও তিনি বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এর আগে সংসদে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও তাদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারব না। আমরা বারবার আহ্বান জানাতে পারি, আশা করতে পারি তারা এখানে অংশগ্রহণ করবে। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজটি করি এবং সংবিধান সংশোধনের আলোচনা করি।’