গরম খুন্তির ছ্যাঁকার কথা মনে হলেই আঁতকে ওঠে তানিয়া

রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে শিশু তানিয়া আক্তার (১১)। তবে তার ওপর চালানো গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের কথা মনে পড়লেই হাসপাতালের বেডে ভয়ে আঁতকে ওঠে সে।

এদিকে, তানিয়ার ওপর নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার (৩৮) ও তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলকে (৪৮) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে কলাবাগান থানার পুলিশের একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে রাজধানীর গ্রিন রোডের ‘গ্রিন কর্নার’ নামের একটি বাসা থেকে তাদের আটক করে।

শিশু তানিয়ার বাবা বেলাল হোসেন বাদী হয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর কলাবাগান থানায় মোর্শেদা আক্তার ও তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৪(২)(খ)/৩০ ধারায় মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মজিবুর রহমান তপাদার গতকাল রোববার ইত্তেফাককে বলেন, আসামিদের ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত মোর্শেদা আক্তারের তিন দিন এবং তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আইও জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের কারাগার থেকে থানা হাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে ভুক্তভোগী তানিয়ার জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যাবে। সেখানেই বিচারকাজ হবে।

তানিয়ার বাবা বেলাল হোসেন জানান, মামলা দায়েরের পর আসামিরা গ্রেপ্তার হলে তানিয়াকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় হৃদয়বান ব্যক্তিদের সহায়তায় তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানো হচ্ছে।

হাসপাতালে তানিয়ার সঙ্গে থাকা তার এক আত্মীয় জানান, ‘ডাক্তারদের আন্তরিক চিকিৎসায় তানিয়া ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। তবে তার ওপর চালানো নিষ্ঠুর নির্যাতনের কথা মনে পড়লে সে ভয়ে আঁতকে ওঠে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’

হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘শিশুটির ওপর যে মাত্রায় নির্যাতন চালানো হয়েছে, তাতে সে মানসিক ও শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। সে এখনও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে।’

তানিয়া খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের নুরু সর্দারপাড়া গ্রামের দিনমজুর বেলাল হোসেনের মেয়ে। মা মারা যাওয়ার পর অভাবের তাড়নায় গত বছরের নভেম্বর মাসে মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া তানিয়াকে তোফাজ্জল নামে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকার কলাবাগানের গ্রিন রোডে মোর্শেদা আক্তারের বাসায় পাঠানো হয়। মোর্শেদা একটি স্কুলের শিক্ষক এবং তার স্বামী সাইফুদ্দিন ব্যবসায়ী।

তানিয়া জানায়, ওই বাড়িতে তার দিন কাটত ভয় আর নির্যাতনের মধ্যে। তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা তাকে বেধড়ক মারধর করতেন। দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই তার ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে জানায় তানিয়া।

তানিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রীর এমন নির্যাতনে স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেল বাধা দিতেন না; বরং তাকে সহযোগিতা করতেন।

নির্যাতনে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর তানিয়াকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে সেখান থেকে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাত ৩টার দিকে মৃতপ্রায় অবস্থায় মেয়েকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান তার বাবা।

শিশু তানিয়ার ওপর চালানো নির্যাতনের খবর সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলে সর্বমহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।