ট্রাইব্যুনালে জুলাইযোদ্ধার সাক্ষ্য ‘ছাত্ররা মাঠে নামলেই গুলি করে মেরে ফেলা হবে’

‘ছাত্ররা মাঠে নামলেই গুলি করে মেরে ফেলা হবে’— চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন মো. হান্নান মিয়া নামের এক জুলাইযোদ্ধা।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর পর সন্ধ্যায় টেলিভিশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১৪ দলের নেতাদের বৈঠকের খবর দেখেন তিনি। ওই বৈঠকের পর কারফিউ ঘোষণার পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা মাঠে নামলে গুলি করে হত্যার কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বৈঠকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলামও ছিলেন।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হান্নানের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এ মামলায় কামরুল ও মেননকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়ে তারা কারাগারে রয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ থাকায় দুজনই ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। এসব অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন উসকানি দিয়েছেন কামরুল ও মেনন। তারা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার ও কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশ এলাকায় ২৩ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।

৪০ বছর বয়সী হান্নান পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। বর্তমানে সাংবাদিকতা করেন। তিনি সরকার ঘোষিত গেজেটে ‘খ’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা। বর্তমানে বাড্ডায় বসবাস করেন। একই এলাকায় তার এসির শো-রুম ছিল।

জবানবন্দিতে হান্নান বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই এসির কাজ করতে আমি ধানমন্ডির জিগাতলায় গিয়েছিলাম। কাজ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আমার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে বাড্ডার উদ্দেশে রওনা হই। পথে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অসংখ্য ছাত্রজনতাকে কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখি। আর বিপরীত দিক থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ গুলি করছিল। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করা হয়। এতে বেশ কিছু ছাত্রজনতাকে রক্তাক্ত শরীরে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। এরপর এই যৌক্তিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

তিনি বলেন, ১৮ জুলাই বেলা ১১টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্রজনতার আন্দোলনে যোগ দিই। তখন বাড্ডা থানার ভেতর থেকে ৬০-৬৫ জনের একটি পুলিশের দল এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে চালাতে এগিয়ে আসেন। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন অলি-গলিতে ঢুকে পড়ি। কিছুক্ষণ পর পাঁচ-ছয়জন আন্দোলনকারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। তাদের উদ্ধার করে মেরুল বাড্ডা এইমস হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সরে গেলে পুনরায় আমরা রাস্তায় নেমে পড়ি। পরদিন ১৯ জুলাই দুপুর ১২টায় আমি বাসা থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যাই। এরপর একটি মিছিল নিয়ে প্রগতি সরণির উদ্দেশে আমরা রওনা হই। কিন্তু দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য পুলিশ-বিজিবি, র‍্যাব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জুমার নামাজের পরপরই নির্বিচারে ছাত্রজনতার ওপরে গুলি চালায়। এতে ১০-১২ জন আহত হন। আমি নিজেও দুজন আহতকে এইমস হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম।

সাক্ষী বলেন, ১৯ জুলাই সন্ধ্যার পর টেলিভিশনে দেখি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলের বিভিন্ন নেতারা গণভবনে বৈঠক করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সামনে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। একই সঙ্গে ছাত্ররা মাঠে নামলেই গুলি করে মেরে ফেলা হবে বলে ঘোষণা দেন। ওই সময় গুলির নির্দেশকে পূর্ণ সমর্থন করেন মেনন ও কামরুল। ২০ জুলাই সকাল ১০টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে অসংখ্য ছাত্রজনতা গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বাড্ডা ইউলুপের গোড়ায় একজনের লাশ পড়েছিল। এর দক্ষিণ দিকে আরও দুজনকে উঠিয়ে রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই। সন্ধ্যার পর লোকমুখে শুনি দুজনই মারা গেছেন।

সাক্ষ্যে হান্নান জানান, স্ত্রী অসুস্থ থাকায় ২১ জুলাই গ্রামের বাড়ি বরগুনায় যান তিনি। দুদিন পর স্ত্রী-সন্তানসহ ঢাকায় চলে আসেন। এরপর ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্রজনতার সঙ্গে ‘লংমার্চে’ যোগ দেওয়ার জন্য অবস্থান নেন। ওই দিন রামপুরা সেতুর দিক থেকে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি ছুড়তে থাকে। এতে তার পায়ে একটি গুলি লাগে। এ ছাড়া, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন তাকে এলোপাতাড়ি পেটান। ফলে তার মাথা ও কপাল ফেটে যায়। বাঁ কাঁধের হাড় ভেঙে বাহু ঝুলে যায়। পরে আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে এইমস হাসপাতালে নিয়ে যান। সন্ধ্যার পর তার জ্ঞান ফেরে।

এ সময় শেখ হাসিনা, কামরুল ইসলাম, রাশেদ খান মেননসহ কারফিউ দিয়ে হত্যা-নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান এই জুলাইযোদ্ধা।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিম ও মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।