স্কুলে যাতায়াতের পথে পরিচয়, তারপর প্রণয় এবং সবশেষে ভালোবেসে ঘর বাঁধা—সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার। তবে নানা জঞ্জালের পর পারিবারিক সম্মতিতে পাওয়া সেই নতুন সংসার দীর্ঘ হতে পারেনি; বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নিথর দেহ হয়ে পড়ে থাকতে হলো ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরীকে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় নিজ ভাড়া বাসা থেকে লামিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, নির্মম নির্যাতনের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর উদ্দেশ্যে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ঘটনার পরপরই হাসপাতালে মরদেহ ফেলে রেখে গা-ঢাকা দিয়েছে অভিযুক্ত স্বামী ও তার স্বজনেরা।
নিহত লামিয়া উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের মহেশ্বরদি সাহাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটু মাতুব্বরের মেয়ে। নানাবাড়িতে থেকে স্থানীয় মুনসুরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত সে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বর থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মরদেহটি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথেই একই উপজেলার কাপুড়িয়া সদরদি এলাকার সোবহান শেখের ছেলে এবং পেশায় গ্যারেজ মিস্ত্রি রনি শেখের সঙ্গে পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে লামিয়া। সেই সম্পর্কের জেরে গত ২০ জুলাই তারা পালিয়ে বিয়ে করে এবং আত্মগোপনে চলে যায়। চলতি মাসেই উভয় পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্ধান পান এবং দুই পক্ষের সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে বিয়েটি মেনে নেওয়া হয়।
পারিবারিক সম্মতির পর গত এক সপ্তাহ আগে মুনসুরাবাদ এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসার শুরু করে নবদম্পতি। কিন্তু সংসার শুরুর পরপরই ওই ভাড়াবাসায় স্বামী ও শাশুড়ি যৌথভাবে লামিয়ার ওপর দফায় দফায় শারীরিক নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ করেন তার নানা আব্দুল ওয়াদুদ খালাসী।
হত্যার অভিযোগ তুলে আব্দুল ওয়াদুদ খালাসী জানান, তার নাতনিকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। লামিয়ার গলায় হাতের আঙুলের সুস্পষ্ট দাগ এবং মুখে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার দাবি, লামিয়াকে মেরে ফেলে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার ভুয়া তথ্য দিয়ে তাদের খবর পাঠায় রনির মা। স্বজনেরা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছালে দেখতে পান সেখানে মরদেহ ফেলে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পালিয়েছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত রনিকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি; তবে অভিযোগ পেলেই যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।