বিশ্ব হার্ট দিবস আজ

দেশে হৃদেরাগজনিত মৃত্যুর অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হৃদেরাগজনিত মৃত্যু। এর অন্যতম কারণ উচ্চরক্তচাপ। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই হৃদেরাগের কারণে ঘটে। ২০২৪ সালে দেশে হৃদেরাগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অকাল মৃত্যু। আর বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদেরাগ। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদেরাগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কথা হয়—জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউটের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ১০ নম্বর বেডে থাকা ৩৭ বছর বয়সি আবদুল করিমের সঙ্গে। তিনি এসেছেন চুয়াডাঙ্গা থেকে। ভর্তি হয়েছেন ২৭ সেপ্টেম্বর। হার্টে তার দুইটা ব্লক আছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। একমাস আগে এনজিওগ্রাম করে জানতে পারেন দুইটা ব্লকের কথা। আবদুল করিম বলেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন। চিকিৎসক জানিয়েছেন, ১৮০ হাজার টাকা লাগবে হার্টে দু্ইটা রিং পড়াতে। 

৬৭ বছর বয়সি এম আলম দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চরক্তচাপ ও বিভিন্ন অসুখে ভুগছিলেন। ২০১৭ সালে ব্রেন টিউমার অপারেশন হয় তার, ২০২০ সালে করোনায় আক্রান্ত হন, ২০২৪ সালে ১৫তম হার্ট অ্যাটাক হয় তার। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। ব্যয় করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। একসময় চাকরি করতেন ফরেন ব্যাংকে। অসুস্থতার কারণে সময়ের আগে তাকে চাকরি থেকে অবসর নিতে হয়েছে। এখন সব হারিয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।

২৫ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন ৪৬ বছর বয়সি আলমগীর হোসেন নামের এক রোগী। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তারা হার্টে ব্লক আছে, রিং পড়াতে হবে, কিন্তু তার প্রেসার নিয়ন্ত্রণে নেই। বর্তমানে লো-প্রেসারের কারণে রিং পড়াতে পারছেন না চিকিৎসক। বুকে তার ব্যথা করে সবসময়।

হাসপাতাল জুড়েই এমন অসংখ্যা রোগীর চোখে পড়ে জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউটে। এখানে বেশি বয়সি রোগী যেমন আছেন, তেমনি আছেন কমবয়সি তরুণ রোগীও। চিকিৎসকরা বলছেন—বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদেরাগ। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদেরাগ ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এই উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে অকালে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতে পারে। তবে এ খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ খুবই কম। এই পরিস্থিতিতে বর্ধিত স্বাস্থ্য বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হলে হৃদেরাগজনিত অকালমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব।

‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ১৮-৩৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বিশ্বে প্রতি বছর হৃদেরাগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুবরণ করেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশেও হৃদেরাগজনিত মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে; দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই হৃদেরাগের কারণে ঘটে। ২০২৪ সালে দেশে হৃদেরাগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অকাল মৃত্যু।

এমন পরিস্থিতিতে আজ ২৯ সেপ্টেম্বর পালিত হবে বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘হার্ট ডিজিজ ক্যান হাইড ইন প্লেইন সাইট: ডোন্ট মিস এ বিট’।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫.৩ শতাংশ থেকে ৭.৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্ধিত এই বরাদ্দের একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করা হলে তা দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদেরাগ ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদেরাগ ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে, কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।