ইতালি নেওয়ার কথা বলে শ্রীলঙ্কা-মিশরে পাচার, চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তার

ইতালি ও ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে প্রথমে শ্রীলঙ্কা ও পরে মিশরে পাচার করে আটকে রাখত একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। সেখানে ভুক্তভোগীদের নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। এ চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

এসআরবি জানিয়েছে, গত ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত আরজু। এই সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ইতালি ও ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তার চক্রের হাত থেকে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪-এর পদাতিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে বনানীর সি ব্লক এলাকায় এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি জানতে পারে, বৃহস্পতিবার (আজ) আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।

এসআরবি কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের ১৬ জুলাই মানবপাচারের শিকার কামরুন্নাহার ফাতেমা মিশর থেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ইতালি নেওয়ার কথা বলে একটি চক্র তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে।

পরে এনএসআই গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করে। ওই সময় আরজু মিশরে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘদিন নজরদারির পর তিনি বাংলাদেশে ফিরলে তার অবস্থান শনাক্ত করে এসআরবি।

কর্মকর্তার ভাষ্য, কামরুন্নাহার ফাতেমা ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আরজু তাদের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না জানিয়ে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়।

শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে পরিবারের তিন ছেলে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দুই মেয়ে কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরা শ্রীলঙ্কায় থেকে যান। পরে আঞ্জুমান আরা পালিয়ে শ্রীলঙ্কার কোনো একটি স্থানে অবস্থান করছেন বলে জানায় এসআরবি।

কামরুন্নাহার ফাতেমাকে পরে ভিসা হবে না বলে শ্রীলঙ্কা থেকে মিশরে নিয়ে যায় চক্রটি। সেখানে তাকে নির্যাতনের পাশাপাশি অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। এতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর আরও নির্যাতন চালানো হয়। তার শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নির্যাতন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে এসআরবি।

শ্রীলঙ্কা ও মিশর থেকে কামরুন্নাহার ফাতেমা এবং আঞ্জুমান আরা ভিডিও বার্তায় তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, আরজু দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে বাংলাদেশিদের বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে আসছেন। তার চক্রের হাত থেকে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিভিন্ন থানায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

এসআরবি জানায়, আরজুর কোনো বৈধ ইমিগ্রেশন ব্যবসার লাইসেন্স নেই। ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে তিনি গ্রামাঞ্চলের মানুষকে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন বলে অভিযোগ। পরে তাদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে আটকে রাখা, অন্যদের কাছে হস্তান্তর এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

আরজুর মোবাইল ফোনে পাওয়া একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের বরাত দিয়ে এসআরবি জানিয়েছে, গত এক বছরে তার হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

মানবপাচারবিরোধী অভিযান সম্পর্কে এসআরবি কর্মকর্তা জানান, ২০২৫-২৬ সালে মানবপাচারের ঘটনায় পরিচালিত অভিযানে ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার আরজু রহমানকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।