বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল সাধারণ নারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, চোখের আইরিশ স্ক্যান ও আঙুলের ছাপ। সেই বায়োমেট্রিক ডেটা হাতিয়ে নেওয়ার কিছুদিন পরই বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের পৃথক মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে নাম আসতে শুরু করেছে ঝিনাইদহের নিরীহ নারীদের। দূরবর্তী জেলা চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরায় দায়ের হওয়া সাইবার ও আর্থিক অপরাধের মামলায় নিজেদের নাম জড়িয়ে পড়ার খবরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে চরম আতঙ্ক ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশের তদন্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো থেকে ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি অনুসন্ধান স্লিপ পাঠানো হয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বরের ওই চিঠিতে চট্টগ্রামের সাইবার পিটিশন মামলার (মামলা নং-৩৯৪/২০২৬, তারিখ ৯ আগস্ট ২০২৬) সূত্র ধরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার ৬১ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের নাম-ঠিকানা, বয়স, পেশা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ রেকর্ড ও স্বভাব-চরিত্র যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়।
একইভাবে সাতক্ষীরার তালা থানার একটি মামলায়ও (সিআর মামলা নং-২৩/২০২৬) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী এলাকার বাসিন্দা নাছিমা খাতুনের নাম উঠে এসেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর পিবিআই সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয় থেকে ঝিনাইদহ পুলিশের কাছে পাঠানো অপর এক স্লিপে নাছিমার পরিচয়, এনআইডি এবং অতীত অপরাধের কোনো রেকর্ড রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্বাস্থ্যসেবা বা সরকারি সহায়তার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে হলিধানী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে নারীদের উদ্বুদ্ধ করে। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের কথা বলে তারা পোর্টাল ডিভাইসের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আইরিশ স্ক্যান এবং এনআইডির অনুলিপি হাতিয়ে নেয়। সরল বিশ্বাসে তথ্য দেওয়ার পর এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অর্থ আত্মসাতের মামলায় জড়িয়ে পড়ার খবর পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
রামচন্দ্রপুর এলাকার আব্দুল হক, জামিলা খাতুন, সোনিয়া খাতুন ও রহিমা খাতুনসহ অন্তত ৩০০ নারীর তথ্য এভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ভুক্তভোগীদের স্পষ্ট বক্তব্য, কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা মোবাইল ব্যাংকিং ফ্রডের সাথে তারা কখনোই যুক্ত ছিলেন না। স্বাস্থ্যসেবার নামে চক্রটি তাদের বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে অবৈধভাবে সিম নিবন্ধন ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলে বড় ধরনের অপরাধ ঘটিয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বায়োমেট্রিক তথ্যের এই অপব্যবহার এবং নারীদের সংশ্লিষ্টতার গভীরতা খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন। ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরা থেকে আসা অনুসন্ধান স্লিপগুলোর বিষয়ে পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়। একই সাথে তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে অপরিচিত কারও কাছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য না দেওয়ার আহ্বান জানান।