জিয়াউল আহসান ছিলেন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ছিলেন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন)। এসব পদে দায়িত্ব পালনকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে জড়িয়ে পড়েন গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। এসব গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন বিএনপিসহ বিভিন্ন বিরোধীর রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এসব অপরাধের ঘটনায় এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। আছে বেশ কয়েকটি মামলা তদন্ত পর্যায়ে। এর মধ্যে রয়েছে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় করা মামলা। রয়েছে লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় বিএনপির পাঁচ নেতাকে ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনায় করা আরো দুটি মামলা। এ মামলার তদন্ত শেষ করতে আরো দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে পরিচালিত গণহত্যার ঘটনায় করা মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই মামলায় পলাতক ৩০ আসামির বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। জিয়াউলসহ ১১ আসামি রয়েছেন কারাগারে।
এদিকে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত পর্যায়ে রয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেছেন মামলার ১৫তম সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। ইতিপূর্বে এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া। সাক্ষ্য দিয়েছেন জিয়াউল আহসানের সঙ্গে র্যাবে কর্মরত বেশ কয়েক জন সেনা কর্মকর্তা। যারা তার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। প্রত্যক্ষদর্শী এসব সাক্ষীর জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের ভয়াবহ নৃশংসতা ফুটে উঠেছে। প্রসিকিউশন বলছে, অক্টোবর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জিয়াউলের বিরুদ্ধে দাখিল করা ফরমাল চার্জে বলা হয়েছে, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হিসেবেও দায়িত্ব পালন কালে তিনি তত্কালীন সরকারবিরোধী রাজনীতিবিদসহ অসংখ্য মানুষকে জোরপূর্বক অপহরণ, গুম ও নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। নিজে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছেন। আবার তার অধীনস্থদের নির্দেশ দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। শুধু হত্যাকাণ্ড করেই ক্ষান্ত হননি নিরপরাধ বন্দিদের পেট ফুঁড়ে হাত ও মাথায় সিমেন্টের ব্লক বেঁধে নদীতে লাশ গুম করেছেন। এইভাবে হত্যা করে লাশ গুম করার প্রক্রিয়াটিকে আসামিরা কোডনেম হিসেবে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ বলে উল্লেখ করত। ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাগেরহাট, সুন্দরবন, বরগুনা ও গাজীপুরে ১০৩ জনকে হত্যার ঘটনা সংঘটিত করেছেন তিনি।
গতকাল ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আংশিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকি জবানবন্দি রবিবার উপস্থাপন করবেন তিনি। তার জবানবন্দির মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ উপস্থাপন শেষ হবে। তিনি বলেন, আসামিপক্ষ সাফাই সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে চাইলে করতে পারবেন। এর পরই শুরু হবে যুক্তিতর্ক। তবে তার বিরুদ্ধে আমরা যেসব অভিযোগ এনেছিলাম, ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যে প্রতিটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।
গাজী তামিম বলেন, তত্কালীন সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াসহ সেনাবাহিনীর কয়েক জন কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন। নিজেদের জবানবন্দিতে জিয়াউল কীভাবে একজন ‘কিলার’ হয়ে উঠেছিলেন, সেসবের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এমনকি র্যাব কর্মকর্তারা কীভাবে ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছিলেন, সেসবও উঠে এসেছে।
তদন্ত চলছে আরো কয়েক শত হত্যাকাণ্ডের
তদন্তকালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ২০১০-২০১৩ সালে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ পদ্ধতিতে কমপক্ষে দুই শত জনকে হত্যা, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী, কমিশনার চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আরো সাত জন, ছাত্রশিবির নেতা গোলাম মর্তুজা মিহিন ও হাফেজ জাকির হোসেনসহ চার জনকে গুম এবং জুলাই গণআন্দোলনে এনটিএমসির মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারি করে অপহরণ, নির্যাতন, গুম এবং হত্যার মাধ্যমে লাশ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন প্রসিকিউশন। এসব ঘটনার বিষয়ে তার বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।