প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন

যে ধারাগুলো সাংবাদিকতার পথ সংকুচিত করতে পারে

জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিতে অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বিদ্যমান সাইবার আইনেই রয়েছে। কিন্তু নতুন খসড়ার ৮(২) ধারায় শুধু তথ্যের ভিত্তিতে নয়, আশঙ্কার ভিত্তিতেও কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়েছে। এতে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন বেশ কিছু ধারা রয়েছে এই আইনে, যে কারণে সাংবাদিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এই ধারাগুলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ আরো সংকুচিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

এই আইনে উদ্বেগের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, খসড়ায় এমন কিছু নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আইনটি প্রয়োগের ক্ষমতা দিচ্ছে, যেগুলো আগে কখনো এর আওতায় ছিল না। এর মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ও রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। বর্তমান আইনের ২৫ ধারায় রয়েছে মূলত অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি এবং শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত উপাদান। কিন্তু সংশোধনীতে এই ধারাটিকে ব্যাপকভাবে বিস্তুৃত করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানহানি, অপমান, হেয় প্রতিপন্ন করা ও বুলিংকেও এর আওতায় আনা হয়েছে। কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে, এমন বক্তব্য, প্রকাশনা ও প্রতিবেদনকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।

এই খসড়া আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ, যে কেউ দাবি করতে পারেন, তার ‘মানহানি’ করা হয়েছে। আর পুলিশ ও অন্যরা কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কনটেন্ট জব্দ করতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নথি নিয়ে যেতে পারে, যা পুরো প্রকাশনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ২৫ ধারায় আগের চেয়েও অনেক কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দুই বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। ভুক্তভোগী কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সি হলে শাস্তি ১০ বছর এবং জরিমানার পরিমাণও অনেক বেশি। সংবাদ প্রতিবেদন-সংক্রান্ত যে বিষয়গুলোকে অপরাধ বলা হচ্ছে, সেগুলো সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ভয় তৈরি করতে পারে। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বেড়ে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ‘গুজব’ বা ‘ভুল তথ্য’ বলতে কী বোঝায়? তার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ছাড়া কোনো অপরাধ যথাযথভাবে নির্ধারণ করে ‘লঙ্ঘনকারীকে’ শাস্তি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? এর ফলে আইনের অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।

২৫ ও ২৬ ধারার বিধানগুলো ব্যাপক পরিসর দিয়ে লেখা হয়েছে। ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘ভুল তথ্য’, ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ ও ‘ভুয়া খবর’—এর কোনোটিরই সুস্পষ্ট সংজ্ঞা খসড়ায় নেই। বিশেষ করে গুজব বলতে কী বোঝায়, সেটা স্পষ্ট না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের। এর মধ্যে এমন অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, ভয় বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বা ‘তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে’।

আইনের ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কর্তৃপক্ষকে কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিকদের গবেষণা ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের প্রয়োজন হয়। এসব সূত্রের অনেকেই পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা একজন সাংবাদিকের ফোন, কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখলে এ ধরনের সূত্র আর কথা বলবে? স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের সূত্র ভীত হয়ে পড়বে, এবং তথ্য দিতে চাইবে না।

নতুন খসড়ায় প্রস্তাবিত সংশোধনী হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার, যা আগের কোনো আইনেই ছিল না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা, যারা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের (ডিএম) অধীনে থাকেন। ডিসিরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার মানে প্রশাসকদের মাধ্যমে বিচার, অর্থাত্ ক্ষমতাসীন সরকারের মাধ্যমে বিচার। প্রতিবেদন সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতি তুলে ধরে? কোনো মন্ত্রী তার ইচ্ছামতো কাজ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে বাধ্য করতে পারেন।

যদিও দুই দিন আগে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া বা তাকে গ্রেফতারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবকে সরকার ‘যুক্তিযুক্ত মনে করছে’ বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আগের আইনটিতে শাস্তির বিধান থাকা ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টিই ছিল জামিন অযোগ্য। খসড়া আইনেও জামিন অযোগ্য ধারা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খসড়া সাইবার আইন সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক সরকার ও স্বচ্ছ প্রশাসনের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি তার সমর্থনের বিষয়ে শুরুতেই অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ে সময় মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, সংশোধন ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন হলে দেশ বৃহত্ কারাগারে পরিণত হবে। আর ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া দেখে উদ্বেগে রয়েছে। একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান ও সিইও আব্দুস সালাম বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কারও পছন্দ না হলে বা কেউ মনে করলে তার মানহানি হয়েছে, সেই অভিযোগে সাংবাদিককে গ্রেফতার বা কারাগারে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, যা থাকা উচিত নয়।

কয়েক দিন আগে এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ -এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত ৩টি জটিল বিষয়কে এক আইনে অন্তর্ভুক্ত করে ৩টির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ‍্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার জগতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ ভিন্ন, এ ধরনের আইনের আওতাবহির্ভূত এবং বৈশ্বিক উত্তম চর্চার পরিপন্থি।’