আবহাওয়ার একটি পূর্বাভাস কখনও কখনও অর্থনীতির পূর্বাভাসও হইয়া উঠে। এল নিনোর সম্ভাব্য তীব্রতা তেমনই একটি সংকেত। আবহাওয়া সংস্থাগুলি বেশ কিছুদিন ধরিয়াই বলিতেছে, এই বার এল নিনো শক্তিশালী হইতে পারে। নভেম্বর মাসে ইহার তীব্রতা সর্বাধিক হইবার আশঙ্কা এবং আগামী মার্চ পর্যন্ত ইহার প্রভাব অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হইয়াছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাণহানি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথাও বলা হইয়াছে। বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে দেখিবার অবকাশ নাই। কারণ জলবায়ুর অভিঘাত বাংলাদেশে কখনও কেবল আবহাওয়ার সমস্যা হিসাবে উপস্থিত হয় না। তাহা দ্রুত খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার সমস্যায় পরিণত হয়।
এল নিনোর সহিত বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক সরল কোনো সমীকরণ নহে। এই সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য তাহাই দেখাইতেছে। জুন পর্যন্ত এল নিনো দুর্বল থাকিলেও সেই মাসে বৃষ্টিপাত ছিল অত্যন্ত কম। জুলাই ও আগস্টে এল নিনো মাঝারি শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টি বাড়িয়াছিল। সেপ্টেম্বরে এল নিনো শক্তিশালী হইলেও নিম্নচাপের কারণে অনেক অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হইয়াছে। অর্থাৎ এল নিনো থাকিলেই বাংলাদেশে খরা হইবে, এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নহে। বিপদটি বরং অনিশ্চয়তায়। কখনও বৃষ্টির ঘাটতি, কখনও অস্বাভাবিক বৃষ্টি, কখনও দীর্ঘ উষ্ণতা-এই অনিয়মই সবচাইতে বড় সমস্যা। বাংলাদেশের কৃষি এই অনিয়মের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বৃষ্টির সময় সামান্য এদিক-সেদিক হইলে বীজতলা, রোপণ, সেচ এবং ফসল কাটার সময়সূচি ব্যাহত হইতে পারে। বৃষ্টির ঘাটতি বাড়িলে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়িবে। তাহাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িবে। আবার অস্বাভাবিক বৃষ্টি হইলে মাঠের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। কৃষি উৎপাদনের এই অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত বাজারে খাদ্যের দামে প্রতিফলিত হইতে পারে।
আরেকটি বিপদ জনস্বাস্থ্য। তাপমাত্রা বাড়িলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত নানা অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে; কিন্তু সকল মানুষ সমানভাবে এই ঝুঁকি বহন করে না। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের কর্মঘণ্টাই তাহাদের আয়ের ভিত্তি। অতিরিক্ত তাপ তাহাদের কাজের সক্ষমতা কমাইতে পারে। ফলে জলবায়ুর অভিঘাত ইহার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আয়হানির কারণ হইতে পারে। নগর বাংলাদেশেও বিপদ কম নহে। কংক্রিটে আবৃত ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে তাপমাত্রা বাড়িলে নগর-উষ্ণতা আরও অসহনীয় হইতে পারে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িবে, শীতলীকরণ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়িবে। অথচ নিম্নআয়ের পরিবারগুলির পক্ষে বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয় বহন করা সহজ নহে। ফলে জলবায়ু-ঝুঁকি সামাজিক বৈষম্যকেও আরও স্পষ্ট করিতে পারে।
তাহা হইলে করণীয় কী? প্রথম কাজ হইল পূর্বাভাসকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সহিত যুক্ত করা। কৃষিতে পানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং অঞ্চলভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা জোরদার করিতে হইবে। শহরগুলিতে গাছ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনার অংশ করিতে হইবে। আবহাওয়ার তথ্যকে বিচ্ছিন্ন দপ্তরের বিষয় না রাখিয়া জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ করিতে হইবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎ, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
এল নিনো আমাদের দুর্বলতাগুলি স্পষ্ট করিয়া দিতে পারে। যেই দেশে একটি অস্বাভাবিক মৌসুম কৃষকের হিসাব পালটাইয়া দেয়, একটি তাপপ্রবাহ শ্রমিকের আয় কমাইয়া দেয়, আর পানির সংকট নগরজীবনকে বিপর্যস্ত করিতে পারে, সেইখানে আবহাওয়ার পরিবর্তনকে কেবল প্রকৃতির খেয়াল হিসাবে দেখিবার সুযোগ নাই। প্রকৃতির পূর্বাভাসকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নাই। প্রয়োজন তাহা বুঝিয়া প্রস্তুত হওয়া। এল নিনোর বিভিন্ন পূর্বাভাস সেই প্রস্তুতিরই আরেকটি জরুরি সতর্ক সংকেত।