ফের হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আঘাতের পরিকল্পনা ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র ফের বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে এখন এমন এক ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী জবাব দিতে হবে। একই সময়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা আরও উসকে উঠা ঠেকানোর চেষ্টা করছে তেহরান।

তিন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। এই পরিকল্পনায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে, মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর স্থাপনা এবং সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানকেও লক্ষ্যবস্তু করার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে কী ধরনের জবাব দেওয়া হবে এবং কখন দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের সামরিক কমান্ডার ও শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনা জোরদার করেছেন।

তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দুই পক্ষের কেউই সমঝোতায় যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে মনে হওয়ায় সামরিক পরিকল্পনা আরও জোরদার হয়েছে।

থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত পদক্ষেপ নেবেন, তা নিয়ে তেহরান এখনো নিশ্চিত নয়। আজিজি বলেন, ‘তবে তারা প্রতীকী পদক্ষেপের জবাবে প্রতীকী জবাব দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে না। বরং, ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশায় তারা উত্তেজনা আরও বাড়াতে চায় বলে মনে হচ্ছে।’

তেহরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনা করছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটি আমেরিকানদের মধ্যে জনপ্রিয় নয়। একই সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির উচ্চ মূল্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। দুই ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা চালালে ইরানকে সহায়তা করার জন্য লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দেশনা ছিল এমন একটি সমন্বিত জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকা, যা ‘হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে এই অঞ্চলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের মার্কিন স্বার্থ পর্যন্ত’ বিস্তৃত হতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।

তবে বৃহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তেহরান এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখছে। ইরানের হিসাব-নিকাশের পেছনে আরেকটি বড় উদ্বেগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সহ্য করতে পারবে কি না।

মার্কিন অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। তেল দেশটির রাজস্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর আগে থেকেই বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ ইরানিদের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তেহরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায়। ইরানের দাবি, প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং সাত দিনের মধ্যে পুরো অঞ্চলে শত্রুতা বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রস্তাবটিতে রয়েছে—যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া, অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড় করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা ছাড় দেওয়া।

শনিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জবাব তেহরানের কাছে পৌঁছেছে এবং ইরান এখন সেটি পর্যালোচনা করছে। ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটন চায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার অংশ হোক। তবে তেহরানের অবস্থান হলো, তাদের নির্ধারিত ‘সাত শর্ত পূরণ হওয়ার পরই’ পারমাণবিক আলোচনা শুরু হতে পারে। তার আগে নয়।

ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান যদি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জবাব প্রত্যাখ্যান না করে এবং পরোক্ষ আলোচনা চলতেও থাকে, তবুও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো সীমিত। ভাতাঙ্কা বলেন, ‘ইরান এমন মার্কিন অবরোধ দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। এটি এমন একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে, যা কার্যত সরকারের ফুসফুস থেকে অক্সিজেন বের করে দেওয়ার মতো। এই পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

আরেকটি যুদ্ধের মূল্য
শত্রুতা শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংঘাত কখনো সাময়িকভাবে থেমেছে, আবার নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে। এই সংঘাতে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আগে থেকেই দুর্বল দেশটির অর্থনীতির ওপর আরও আঘাত এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যুদ্ধ ট্রাম্পের পরিবর্তিত লক্ষ্যগুলো অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং একই সময়ে পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। ইরান ও তার মিত্ররা পুরো অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।

এর অংশ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি বেড়েছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরা সৌদি আরবের স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

বাব এল-মান্দেব প্রণালির দিকে হুতিদের অগ্রসর হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনপথে দ্বিতীয় একটি চাপের কেন্দ্র তৈরি করেছে। এর ফলে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, সামরিক চাপ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমন্বিত প্রভাব ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য দিন দিন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

যুদ্ধের সময় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ভয়
এই চাপ ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইরানের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা বলেন, নেতারা ভয় করছেন—জানুয়ারিতে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তখন দেশের অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।

শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমন করে। এতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয় বলে ওই কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের ভেতরে যখন অস্থিরতা চলছে, একই সময়ে রাষ্ট্র যখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও বোমা হামলার মধ্যে রয়েছে, তখন এটি ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।’

জানুয়ারির বিক্ষোভের বার্ষিকী যত এগিয়ে আসছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ততই নিয়ন্ত্রণ কঠোর করছে। একই সঙ্গে তারা জনগণকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করছে এবং সরকারের অনুগত সমর্থকদের রাতে অনুষ্ঠিত সমাবেশগুলোতে আবার অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ইরান সরকার ভিন্নমত দমনের অভিযান আরও জোরদার করেছে।