হাম আক্রান্ত এক শিশুর মায়ের আহাজারি

‘আল্লাহ আমার বাচ্চাটারে বাঁচাও’

‘আল্লাহ আমার বাচ্চাটারে বাঁচাও’—হামে আক্রান্ত শিশুর মা রিমা আক্তার সন্তানের জীবন বাঁচাতে এভাবেই আহাজারিতে করছিলেন। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে গতকাল সকালে মায়ের এমন কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। ১৬ নম্বর বেডে ১১ মাস বয়সি শিশু মুসতাব ভর্তি। এখন তাকে নিতে হবে পিআইসিইউতে। নিস্তেজ হয়ে মায়ের কোলে চোখ বন্ধ করে আছে মুসতাব, নাকে অক্সিজেনের পাইপ, মুখের ওপরে স্কচটেপ দিয়ে লাগানো। মায়ের কান্নার শব্দে শিশু মুসতাব একবার চোখ খুলে তাকায়। শিশুটিকে আইসিইউতে নিতে হবে বলে, নার্সরা ক্যানোলা লাগাতে নিয়েছিল, কিন্তু হাত-পা-মাথা কোথাও ভেইন পাওয়া যাচ্ছে না। মায়ের সামনে শিশুর শরীরে সুচের এমন—আঘাত দেখে মা কাঁদছেন আর বলছেন—‘আমার বাচ্চাটারে আর কষ্ট দিও না আল্লাহ, সুস্থ করে দাও...’

হাসপাতালগুলোতে সয়লাব হামের রোগী। সাড়ে পাঁচ মাসেও হাম পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। আর এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু তার ধরন বদলিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলো সব সময় দেখা যায় না। ফলে মানুষ সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করে এবং হঠাৎ করে রোগী খারাপ হয়ে শকে চলে যায়; তখন রোগী-চিকিৎসক উভয়ে বিপদে পড়ে।  

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, যারা ডেঙ্গুতে একবার আক্রান্ত হয়েছেন, তারা দ্বিতীয় বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে, সেটা খুব মারাত্মক হয়। তিনি বলেন, ডেঙ্গু তার আচরণ বদলিয়ে ফেলেছে। ডেঙ্গুর সাধারণ যে লক্ষণগুলো—সেটা অনেক সময় দেখা যায় না। দেখা যাচ্ছে—সামান্য জ্বর, ১০১ বা ১০২ ডিগ্রি জ্বরে ডেঙ্গু হচ্ছে; হাই ফিভার, গায়ে র‌্যাশ থাকছে না—এতে অনেকে অবহেলা করে, পরে দেখা যায়— রোগী হঠাৎ করে শকে চলে যাচ্ছে। এতে রোগীও ভোগে, চিকিৎসকরাও বিপদে পড়ে যায়। যে কারণে সামান্য জ্বর-সর্দি-কাশি হলেও ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে চললে, রোগী খারাপের দিকে যাবে না। বিশেষ করে বাচ্চা, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারী বা যারা অন্য রোগে ভুগছে, যেমন ক্যানসার, হার্টের, কিডনি, চোখের সমস্যা আছে। এসব বিষয় খেয়াল রাখলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর রেট কমিয়ে আনা সম্ভব। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা চাই ডেঙ্গুতে যেন মানুষ আক্রান্ত না হয়। হাসপাতালগুলোতে রোগী দিয়ে সয়লাব, কোথাও বেড ফাঁকা নেই।’         

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য: গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গ মিলে শিশুমৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২২ জনে। এই সময়ের মধ্যে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫২ শিশু। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪৩ শিশু, বাকিরা আক্রান্ত হয়েছে হাম উপসর্গে।    

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ও ইনস্টিটিউটের তথ্য: হাসপাতালে এখনো হামজনিত কারণে ভর্তি ৯৮ শিশু। এ পর্যন্ত শুধু এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৯৮৯ শিশু। যাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ শিশুর। গত ২৪ ঘণ্টায় ঐ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে দুই শিশুর। ঐ হাসপাতালে চলতি বছর হামজনিত রোগে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে—জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ৬, মার্চে ১৩০ শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়, এরপর এপ্রিলে ৩২৮ জন, মে মাসে ৪৯৯, জুনে ৫৩৪ জন, জুলাইয়ে ৫০১ জন শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়। এর পর আগস্ট মাসে চিকিৎসা নেয় ৪৯৭ জন, সেপ্টেম্বর ভর্তি রোগী ছিল ৪৬৬ জন। আর অক্টোবর ভর্তি হয়েছে ২৬ রোগী।

বয়সভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়: হাম আক্রান্ত ছয় মাস বয়সি রোগী ছিল ৬৩০ জন, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সি রোগী ছিল ৯৪৯ জন, ৯ থেকে ২ বছর বয়সি রোগী ছিল ৭৭৮ জন, ২ থেকে ৫ বছর বয়সি রোগী ছিল ৩৫৩, আর পাঁচ বছর বয়সি ভর্তি রোগী ছিল ২৭৯ জন শিশু।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি: ডেঙ্গু জ্বরে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ৬০৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৬ জনে। অন্যদিকে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৮৪ হাজার ৩৬৯ জনে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৭৮ হাজার ৪৮২ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে মোট ৫ হাজার ৬৩১ জন।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, হামে আক্রান্ত রোগী এখনো আছে। তবে যারা আগে আক্রান্ত হয়েছিল, তারা বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে আসছে; যেমন—নিউমোনিয়া। তবে তুলনামূলক নতুন আক্রান্ত রোগী কমেছে। পাশাপাশি এখন ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে তারা বেশির ভাগ কমপ্লিকেটেড হয়ে আসছে।