মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী

অধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা না থাকা সত্ত্বেও অস্বচ্ছ একটি প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় রোববার মালয়েশিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার মিয়ানমারের অভিবাসী যুদ্ধবিধ্বস্ত নিজ দেশে ফিরেছেন।

এএফপি’র সাংবাদিকরা দেখেছেন, মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে করে প্রত্যাবাসিতরা কাছের থানলিন নৌঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর কয়েক ডজন অভিবাসীকে বাসে করে অভিবাসন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি বৌদ্ধ মঠের হলঘরে নেওয়া হয়। মিয়ানমারের থানলিন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ায় একটি কফির দোকানে কাজ করতেন ৫৩ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ার থেইন। সেখানে গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমি এখনো পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।’

তিনি জানান, এক বছর আট মাস আটক থাকার সময় তিনি খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হন। দেশে ফিরতে চাওয়ার এটি একটি কারণ। তবে এখন তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।

মেঝেতে সারিবদ্ধ হয়ে পা ভাঁজ করে বসা পুরুষদের মধ্যে কয়েকজনের টি-শার্টে লেখা ছিল ‘উই লাভ মিয়ানমার।’ তাদের মাঝে বসে কিয়াও সোয়ার থেইন বলেন, ‘আমি কোনো কিছুই আশা করি না।’

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক আইনে যে ধরনের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে, দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

মালয়েশিয়া বলছে, আটককেন্দ্রের সব অভিবাসী স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, মিয়ানমারের অভিবাসীদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প ছিল না।

রোববার ভোরে কয়েক শত পরিবার গাড়ি নিয়ে নৌঘাঁটির বাইরে জড়ো হয়। তারা স্বজনদের নিতে এসেছিল। কেউ কেউ কাগজে স্বজনদের ছবি বা নাম লিখে তা তুলে ধরেন।

কিছু পরিবারকে ঘাঁটির ফটক পেরিয়ে স্বজনদের স্বাগত জানানোর অনুমতি দেওয়া হলেও অধিকাংশের তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার আশা ভেস্তে যায়।

এক নৌ কর্মকর্তা মেগাফোনে চিৎকার করে বলেন, ‘আপনারা এখনই তাদের নিয়ে যেতে পারবেন না।’ তিনি জানান, প্রত্যাবাসিতদের প্রথমে ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হবে।

এক নারী তার ১৯ বছর বয়সী ভাইকে খুঁজছিলেন। তিন মাস আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী বলেন, ‘আমরা প্রত্যাবাসিতদের তালিকায় তার নাম দেখেছি। কিন্তু তাকে খুঁজতে আমরা ভেতরে যেতে পারিনি।’

৫৫ বছর বয়সী কিয়াও মিন্ট জানান, মালয়েশিয়ায় এক বছরেরও বেশি সময় আটক থাকা তার তিন নাতি-নাতনিকে এখন মিয়ানমারে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হতে পারে বলে তিনি উদ্বিগ্ন। তার আশঙ্কা, ‘শুধু সামরিক বাহিনী নয়, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও’ তাদের নিয়োগ করতে পারে।

রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব-
রোববার ভোরে মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ অভিবাসীদের নিয়ে থানলিন নৌঘাঁটিতে ভিড়েছে বলে এক নৌ কর্মকর্তা জানান। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় এএফপি তার নাম প্রকাশ করেনি।

মিয়ানমার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসীকে নিয়ে জাহাজগুলো মঙ্গলবার মালয়েশিয়া ছেড়ে যায়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার যে ৫ হাজার অভিবাসীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে, এটি তাদের প্রথম দল।

মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম জানিয়েছে, ফেরত আসা ব্যক্তিদের বেশিরভাগই পুরুষ। তাদের মধ্যে ২৭ শিশু ও ৭৯ জন নারী রয়েছেন।

এক অভিবাসী তার পরিবারকে জানান, তাকে জাহাজে করে ফেরত পাঠানো হবে। তার বোন বলেন, ‘আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো, তার ফিরে আসা নিরাপদ হবে কি না।’

ফেরত পাঠানোদের মধ্যে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের কেউ রয়েছেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শরণার্থীদের, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে আনোয়ার জুলাইয়ে এই প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দেন।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক দমন-পীড়ন শুরুর পর রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই দমন-পীড়ন গণহত্যার শামিল ছিল।

মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠই রোহিঙ্গা। তবে জাহাজে কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন, এ বিষয়ে এএফপি’র প্রশ্নের জবাব দেয়নি কুয়ালালামপুর।

‘ফেরত পাঠানোর সময় নয়’-
মিয়ানমার বলেছে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা মালয়েশিয়ায় অভিবাসন-সংক্রান্ত অপরাধে সাজা ভোগ করেছেন।

ফোর্টিফাই রাইটসের মতো পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো আটককেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, ফেরার সিদ্ধান্ত ‘সত্যিই স্বাধীন ও জেনে-বুঝে নেওয়া হয়েছিল কি না’ তা নিশ্চিত করতে গত সপ্তাহে তাদের কর্মীদের অভিবাসীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি অভিবাসীর দ্বিতীয় একটি দলকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। দেশটির দাবি, এসব অভিবাসী আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত বোঝা তৈরি করেছে।

অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা দখলকারী মিয়ানমারের নেতা মিন অং হ্লাইং এপ্রিলে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রত্যাবাসন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে তিনি শিগগিরই মালয়েশিয়া সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মিয়ানমার গত মাসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, প্রত্যাবাসন হবে ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।’

তবে ফোর্টিফাই রাইটসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লাই শেং এএফপিকে বলেন, ‘ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠী কী আচরণ করবে, তা বলা সম্ভব নয়।’

পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের শেষ দিকে সামরিক বাহিনীর এক বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত হন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক মঙ্গলবার বলেন, ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জরিত একটি দেশে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানোর এখন কোনো সময় নয়।’