আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

জীবনের প্রথম আলোকবর্তিকা

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শিক সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। ঐতিহ্যগত নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তে দূরত্ব ও আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে। উঠে যাচ্ছে শ্রদ্ধাবোধ, মধুর সম্পর্ক রূপ নিচ্ছে তিক্ততায়। কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষাঙ্গনে বাণিজ্যিকীকরণ, অতিমাত্রায় রাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার প্রথাগত সম্মান ও সম্পর্কের আদর্শিক ভিত্তি নষ্ট করেছে। এ কারণে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সহানুভূতিশীল মনোভাবের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিষ্টাচার ও সহনশীলতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষককে কেবল তথ্য প্রদানকারী না হয়ে নৈতিকতার অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হতে হবে। শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক হতে হবে ভয় বা ক্ষমতার নয়, বরং ভালোবাসা, সম্মান ও বিশ্বাসের। শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগী জায়গাগুলো অনুধাবন করা এবং গঠনমূলক সংলাপ বাড়ানো।

আজ ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষকদের পাশে :পেশা সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’। প্রতিপাদ্যটির মধ্যেই এবারের আয়োজনের মূল বার্তা স্পষ্ট। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পেশাগত মর্যাদা ও কাজের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

নৈতিকতার বিচারে শিক্ষকরা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তারাই মানুষ গড়ার কারিগর। দুনিয়ায় যারাই মহৎ হয়েছেন বা উচ্চতর পদে সমাসীন হয়েছেন, তারা কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে জ্ঞানার্জন করেছেন। সুতরাং সম্মানজনক পেশাগুলোর মধ্যে শিক্ষকতাও একটি মহৎ পেশা। সাবেক ও বর্তমান ১৫ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকদের একটি শ্রেণির নানান কর্ম ও দায়িত্বহীনতার কারণে এখন আর শিক্ষকদের সেই আগের সম্মানের আসন অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেখানে শিক্ষক তার ক্লাসের সব শিক্ষার্থীর নাম জানলেও পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনকালে তাদের চিনতেন না, নকল সরবরাহ করতেন না, পরীক্ষার হলের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিতেন না। কিন্তু বর্তমানে ঘটতে দেখা যায় ঠিক তার উলটো চিত্র। আগে পড়া না হলে ইচ্ছেমতো মারতেন বেত দিয়ে, কিন্তু তার পরও শিক্ষার্থীদের কোনো অভিযোগ ছিল না, তেড়ে আসতেন না অভিভাবক। কারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন ছিল অটুট। পাবলিক পরীক্ষা এলেই শিক্ষকদের বেড়ে যেত ব্যস্ততা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে কারো কোনো সমস্যা আছে কি না। অভিভাবকরা চিন্তামুক্ত থাকলেও, চিন্তাযুক্ত থাকতেন শিক্ষকরা।

কী মধুর ছিল সেই সম্পর্ক! কী মধুর ছিল সেই দিনগুলো! গুরুদের মতো পরামর্শ দেন বলে তো একজন শিক্ষক ছাত্রের বন্ধু। ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দের পার্থক্য নির্দেশ করে নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে তোলেন বলে একজন শিক্ষকের ভূমিকা দার্শনিকের। আবার, জীবনের সব ক্ষেত্রে চলার নির্দেশনা প্রদান করে ছাত্রের ভবিষ্যৎ চলার পথকে সুগম করে দেন বলে তিনি একজন পথপ্রদর্শক বা গাইড। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে বিচার করেছেন ‘পরস্পর নির্ভর, সৌহার্দ্যমূলক হিসেবে। সে সম্পর্ক কেবল পুঁথিগত বিদ্যা শেখানো ও শেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়।’

বিশ্বে গড়ে মাত্র ৩৬ ভাগ ছাত্রছাত্রী তাদের শিক্ষকদের সম্মান করেন: যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনোমিক্স অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ‘গ্লোবাল টিসার্চ স্ট্যাটাস ইনডেক্স’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে গড়ে মাত্র ৩৬ ভাগ ছাত্রছাত্রী তাদের শিক্ষকদের সম্মান করেন। এছাড়া শিক্ষকতা পেশাও সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা হারাচ্ছে অনেক উন্নত দেশে। যদিও ঐ জরিপে আমাদের দেশকে দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তবে আমাদের দেশেও যে শিক্ষকদের সম্মান আগের মতো নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না অতীতের সুসম্পর্কের সেই দিনগুলোর অস্তিত্ব। অতীতে অর্থের বিনিময়ে জ্ঞান বিতরণ করা হলেও অর্থ সেখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল না। শিক্ষকরা নিজেকে নিঃশেষ করে জ্ঞান বিতরণ করে তাতেই পেতেন পরম আনন্দ।

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা এখনো সহকারী শিক্ষক: প্রাথমিকেই শিশুর শিক্ষার ভিত তৈরি হয়। কিন্তু যারা সেই ভিত রচনা করেন, সেই শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। বেতন গ্রেড ১৩তম। অথচ শিক্ষার এ স্তরে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের। সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পৌনে ৪ লাখ সহকারী শিক্ষক কর্মরত আছেন। এদিকে একই পাঠ্যক্রম, একই ক্লাসঘণ্টা ও সমপরিমাণ দায়িত্ব পালন করলেও ৫৫ বছর ধরে পাহাড়সম আর্থিক বৈষম্যের শিকার দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক। দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রায় ৯৭ ভাগ অবদান রেখে চলা এসব শিক্ষকের যাপিত জীবনের বিরাট অংশ জুড়ে লেগে আছে আর্থিক অনটন আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনা। শিক্ষকদের এই বঞ্চনায় তলানিতে যাচ্ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষকদের মানমর্যাদা না বাড়িয়ে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর কোনো সরকারই শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্য সেভাবে ভাবেনি। যে কারণে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় দৈন্যদশাও কাটেনি।

ছয় দশক পর বদলে গেছে শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ :২০২৬ সালে এসে সেই ১৯৬৬ সালের সুপারিশের বয়স ৬০ বছর। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থাও। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয় এখন শিক্ষকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ইউনেস্কো বলছে, এসব পরিবর্তন শিক্ষকদের সামাজিক, পেশাগত ও বস্তুগত মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলছে। কোথাও শিক্ষকতা পেশা যথেষ্ট স্বীকৃতি পাচ্ছে না, কোথাও শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণে মতামত দেওয়ার সুযোগ সীমিত। আবার কম বেতন, অতিরিক্ত কর্মভার ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অভাবও শিক্ষকদের কাজকে কঠিন করে তুলছে। এ কারণেই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু অতীতের একটি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ৬০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন নয়। বরং আগামী দিন শিক্ষকতা পেশাকে কীভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও কার্যকর করা যায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।