বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার মনে করে কানাডা: হাইকমিশনার

কানাডা বাংলাদেশকে শুধু বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিং।

সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর সমাপনী দিনে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ-কানাডা সম্পর্কের বিষয়ে কানাডার হাইকমিশনার বলেন, ‘পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথমদিকের স্বীকৃতিদাতা দেশগুলোর একটি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করতে পেরে কানাডা অত্যন্ত গর্বিত। আমরা সেই ইতিহাস নিয়ে অনেক গর্ব করি।

তিনি বলেন, ‘এখন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জিং সময়েও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। এছাড়া গত মাসে কানাডিয়ান পটাশ সার সরবরাহের জন্য সরকার-টু-সরকার একটি নতুন চুক্তি ঘোষণা ক‌রে‌ছে। ২০১৪ সাল থেকে এই ব্যবস্থার ফলে ৩.৫ মিলিয়ন টনেরও বেশি কানাডিয়ান পটাশ বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়েছে।

অজিত সিং বলেন, ‘কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সাহায্যনির্ভর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এমন একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে দুই দেশ পরস্পরের পরিপূরক শক্তিকে কাজে লাগাবে। এর মাধ্যমে উভয় দেশের মানুষের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব হবে।

কৌশলগতভাবে মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে কানাডার হাইকমিশনার বলেন, এসব দেশকে সার্বভৌমত্ব ও উন্মুক্ততার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে না। একইভাবে জাতীয় স্বার্থ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মধ্য থেকেও একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, বহুমেরুবিশিষ্ট বিশ্ব মানেই অনিবার্যভাবে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা নয়। সেখানে ভিন্ন ধরনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

কানা‌ডিয়ান হাইক‌মিশনার ব‌লেন, আমরা এমন দেশগুলোর মধ্যে একে অপরের ওপর পরিপক্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারি, যারা সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোতে সহযোগিতা করতে চায়। একটি জোট হয়তো সংকটপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে, আরেকটি জোট খাদ্য নিরাপত্তায় মনোযোগ দেবে, অন্যটি সামুদ্রিক নিরাপত্তায়, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য কিংবা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারে কাজ করবে এবং এই তালিকা চলতে থাকবে।

তিনি বলেন, সব জোটের সদস্যপদ একই হতে হবে এমন নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নেটওয়ার্ক যেন বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী হয় এবং নাগরিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ফলাফল দিতে সক্ষম হয়। বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে কানাডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

কানাডিয়ান হাইকমিশনার বলেন, শুধু আকার কিংবা সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত কোনো বিশ্বব্যবস্থা সাধারণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। বাংলাদেশ, কানাডা এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থ অনেকাংশে একটি কার্যকর ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

তি‌নি আরও ব‌লেন, আমাদের স্বার্থে কাজ করে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সার্বভৌমত্ব গুরুত্বপূর্ণ, আন্তর্জাতিক আইন গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশগুলো নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন না দিয়েই একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে। আর এমন একটি ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য প্রচলিত বৃহৎ শক্তিগুলোর বাইরে গিয়েও নেতৃত্বের প্রয়োজন হয় কানাডা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর তরফ থেকে।