প্রতিবন্ধকতাকে জয়

ভিক্ষা, চুরি, দুর্নীতি কিংবা কোনো অসত্ পথে নয়, তিনি জীবিকানির্বাহের তাগিদে বেছে নিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসা। দুটি পা তার অকেজো। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করেন না। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি পৌঁছেছেন তার লক্ষ্যে। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে জীবন চালাচ্ছেন তিনি। নিজের জীবনটাকে সামলে নিচ্ছেন প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে। শত বাঁধা-বিপত্তি আর সমাজের কটুকথাকে প্রাধান্য না দিয়ে আপন মহিমায় জীবনকে সাজিয়ে তুলেছেন তিনি। শুধু নিজেই সচ্ছল হচ্ছেন না, তার ছোট্ট এ দোকানে আরেক যুবকেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করা যুবক মো. ইকবাল হোসেন রাসেল।

জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী নন ইকবাল হোসেন। জীবনের প্রথম অধ্যায়ের বেশকিছু সময় সুস্থ ছিলেন। যখন তার বয়স ৫ বছর তখন থেকেই জীবনযুদ্ধ শুরু। অজানা এক জ্বরের কবলে পড়ে হঠাত্ দু-পায়ের চলনশক্তি হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যান তিনি। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের। তখন চিকিত্সা ব্যবস্থা ততটা আধুনিক ছিল না বলেই হয়তো সামান্য জ্বরের কবলে পড়ে হারাতে হয়েছিল পা।

হঠাত্ করেই পা হারিয়ে বিপাকে পড়া রাসেলকে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দেন তার বাবা আবদুস সত্তার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ততটা না পেলেও একজন মানুষের জীবনে চলার পথে যে শিক্ষাটা পাওয়া দরকার তার পুরোটাই দিয়ে গেছেন তার পিতা। প্রাথমিকে ভর্তি হলেও স্কুলে তেমনটা যাওয়া হয়নি তার। প্রতিবন্ধীদের জন্য তখন লেখাপড়ার তেমন কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

জ্বরের সাথে হার মেনে নিজের পা হারালেও জীবনযুদ্ধে ঠিকই জয় ছিনিয়ে এনেছেন তিনি। প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে চলছেন। ছোটবেলায় পঙ্গুত্ব বরণ করা রাসেল সমাজের শত তিরস্কার দূরে ঠেলে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। প্রথম প্রথম সমাজের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারলেও বর্তমানে সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। নিজেকে এখন আর তিনি দোষ দেন না। ভাগ্যকে মেনে নিয়েই জীবনে চালিয়ে নিচ্ছেন।

ছোটবেলায় পঙ্গুত্ব বরণ করায় বাবা বেশ চিন্তিত ছিলেন ছেলেকে নিয়ে। কিছু একটা করতে হবে, আর তারই ধারাবাহিকতায় বাড়ির পাশেই ছোট্ট একটি দোকান দেন। বাজার থেকে চিপস, চকলেটসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রি করতে দেন ছেলেকে। একটা সময় বাবা বুঝতে পারেন যে, ছেলের ভবিষত্ বলে একটা কথা আছে। সুতরাং এখানে পড়ে থাকলে হবে না। তাই ছেলেকে রূপসা বাজারে দোকান ভাড়া করে দেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে কিছুদিন পরই বাবা মারা যান। এরপরও তিনি ঘুরে দাঁড়ান। ব্যবসায়ের পরিধি বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে তার দোকানে ফ্লেক্সিলোড থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া দোকানে রয়েছে খাতা-কলমসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। 

তিন ভাই এক বোনের সংসার তাদের। ইকবাল সবার ছোট। বিয়েও করেছেন। পিতা-মাতার আদরের সন্তান ছিলেন তিনি। আত্মীয়, পরিবার-পরিজন সকলের কাছেই পেয়েছেন অঢেল ভালোবাসা। মাঝে মাঝে কেউ আবার হীন চোখেও দেখেছে। কিন্তু কোনোকিছুকেই পাত্তা দেননি তিনি। ছুটে চলেছেন আপন মহিমায়। 

সকাল ১০টায় তার নিজের দোকানে আসেন হুইল চেয়ারে করে। নিজেই একা একা নেমে পড়েন চেয়ার থেকে। এরপর হাতের সম্বল হিসেবে থাকে দুটি পিঁড়ি। কোনোরকমে পিঁড়ির ওপর ভর করে ওঠেন মূল দোকানে। মাঝে মাঝে দোকানে উঠতে পড়ে গিয়ে ব্যথাও পেয়েছেন।

প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে থাকাটা যে কত কষ্টের তিনি তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছেন। যদিও প্রবল মনোবল আর মনের জোরে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন। কিন্তু আসলেই প্রতিবন্ধীরা যে কত কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন তা তিনি বোঝেন। আর তাই তিনি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে চান।