উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম বয়সী তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে গুরুতর আইনি ফাঁদে পড়ছেন বাংলাদেশি স্টুডেন্ট ও কেয়ার কর্মীদের কেউ কেউ। ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বয়স ও পরিচয় গোপন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বা যৌন কথোপকথন এবং পরবর্তীতে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে গিয়ে গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছেন অনেকে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক গ্রেপ্তারের ভিডিও প্রবাসীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা তৈরি করেছে।
প্রকাশ্যে আসা বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, অনলাইনে চ্যাটিংয়ের পর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে গিয়ে তাদের অভিভাবকদের হাতে ধরা পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবকরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটকে রেখে স্থানীয় পুলিশের হাতে সোপর্দ করছেন এবং এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাজ্যের যৌন অপরাধসংক্রান্ত আইন অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে যৌন সম্মতির সাধারণ বয়স ১৬ বছর নির্ধারণ করা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে, ১৬ বছরের কম বয়সীদের সঙ্গে যেকোনো যৌন যোগাযোগ বা যৌন উদ্দেশ্যে সম্পর্ক স্থাপন আইনত বৈধ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচয় গোপন রেখে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনায় দেশটিতে কঠোর শাস্তির একাধিক নজির রয়েছে।
ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের (সিপিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রুহেল মিয়া নামের ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি স্ন্যাপচ্যাটে ১৫ বছর বয়সী কিশোর সেজে তিন কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ধরনের অপরাধে গ্রেটার ম্যানচেস্টারে কিরখান নামের এক ব্যক্তি ভুয়া পরিচয়ে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনায় ৩০টি অপরাধে দোষী প্রমাণিত হয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এবং ন্যাশনাল পুলিশ চিফ কাউন্সিলের (এনপিসিসি) দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশটিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছেছে। এই ধরনের অপরাধ দমনে যুক্তরাজ্য পুলিশ প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করছে এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ শিশুকে সুরক্ষামূলক হেফাজতে নিচ্ছে।
সিপিএসের নির্দেশনা অনুসারে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে যৌন প্রকৃতির যোগাযোগ স্থাপন করলে তা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সেক্সুয়াল অফেন্স অ্যাক্ট ২০০৩-এর সেকশন ১৫(এ)-তেও এ ধরনের আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্পষ্ট করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কেবল সরাসরি শারীরিক সম্পর্কই অপরাধ নয়; ‘শুধু চ্যাট করেছি’, ‘শুধু ছবি আদান-প্রদান হয়েছে’ কিংবা ‘কেবল দেখা করার কথা হয়েছিল’—এমন অজুহাত আইনের চোখে কোনো ছাড় দেয় না। অনলাইনে আলাপের পর অপ্রাপ্তবয়স্ক কারও সঙ্গে যৌন উদ্দেশ্যে দেখা করার পরিকল্পনা করাও গুরুতর অপরাধ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তা কেবল আদালতের কারাদণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে অভিবাসন মর্যাদায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। অপরাধের মাত্রা ও সাজার কারণে যুক্তরাজ্যে থাকার ভিসা বা কাজের অনুমতি বাতিলসহ স্থায়ীভাবে প্রবেশ নিষিদ্ধ হতে পারে।
বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বিদেশে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা অনেক তরুণের জন্য অনলাইনের একটি অসতর্ক ভুল সিদ্ধান্ত আজীবনের ট্র্যাজেডিতে রূপ নিচ্ছে। একটিমাত্র অভিযোগের কারণে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার, চাকরি হারানো ও মানসিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে দেশত্যাগের ঝুঁকিতে পড়ছে তাদের পুরো প্রবাসজীবন।