গত ছয় বছরে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৯১২টি। সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০২৫ সালে। ঐ এক বছরেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১০২ জন। অর্থাৎ গত ২০২৪ সালের তুলনায় অপহরণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭১.৬৫ শতাংশ। চলতি বছরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অপহরণের ঘটনা ৮০০ ছাড়িয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছেন মানুষ। স্বজনদের চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। কেউ ফিরছেন মুক্তিপণ দিয়ে। কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে। আবার কেউ নিখোঁজই থেকে যাচ্ছেন। অপহরণের এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্রে বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অপহরণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মুক্তিপণ আদায় অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ, ব্যাবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, প্রতিশোধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার থেকেও অপহরণের ঘটনা ঘটছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমাজের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে, তখন অপরাধীরা যেসব ঘটনা ঘটায় তার মধ্যে অপহরণ একটি অন্যতম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এই অপহরণের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রথমেই সব অপহরণের ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। যারা এর পেছনে জড়িত বা নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অনেক অপহরণের ঘটনায় দায়ের করা জিডি বা মামলায় রাজনৈতিক রং লাগানো হয়। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঠিকভাবে তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরো কঠোর হতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের নথিভুক্ত মামলার চেয়ে প্রকৃত অপহরণের ঘটনা আরো বেশি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে মামলা না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুলিশের পরিসংখ্যানে যে চিত্র উঠে আসছে, প্রকৃত পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে অপহরণের ঘটনা ছিল সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে ৪৬৩টি, ২০২২ সালে ৪৬০টি এবং ২০২১ সালে ৪৪৫টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪২টিতে। আর ২০২৫ সালে এক লাফে তা ১ হাজার ১০২টিতে পৌঁছে যায়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে ৬৫৭টি। অর্থাত্ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঘটনা বেড়েছে প্রায় দেড় গুণেরও বেশি। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসেই অপহরণের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। জানুয়ারিতে ১০৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮, মার্চে ৮৩, এপ্রিলে ৮৮, মে মাসে ৮২, জুনে ৮০, আগস্টে ৯০ এবং সেপ্টেম্বরে ৯৬ জন অপহরণের শিকার হন। অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ১১০ জন অপহরণের শিকার হন। এসব হিসাব অনুযায়ী বছরের প্রথম ১০ মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে অপহরণের ঘটনা ছিল ৫০১টি। অর্থাত্ ঐ সময়ে মাসিক গড় ছিল প্রায় ৫০টি। পরের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে মাসিক গড় প্রায় ৯২টিতে দাঁড়ায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে অপহরণের ঘটনায় ৬৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই হয়েছে ১২৯টি মামলা। অর্থাত্ সারা দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি করে অপহরণের মামলা হয়েছে।
অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটছে
অপহরণের পাশাপাশি অপহূত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় অপহরণের প্রায় চার ঘণ্টা পর মহাসড়কের পাশ থেকে ইসফাতুল ইসলাম নামে এক ছাত্রদল নেতার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সাম্প্র্রতিক সময়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে তার অপহরণ ও হত্যার পেছনে আর্থিক কারণ থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ ধরনের ঘটনায় অপহরণের উদ্দেশ্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোথাও মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণ করা হচ্ছে, আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যাবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ কিংবা প্রতিশোধের জেরে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ঘটছে।
মুক্তিপণ দাবির ঘটনা বাড়ছে
সম্প্রতি চট্টগ্রামে মো. হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে তাকে অপহরণ করা হয়। পরদিন তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের মোবাইল ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে দুর্বৃত্তরা।
গাইবান্ধায়ও সাইমুম ইসলাম সাইম নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনা ঘটে। পুরান ঢাকার কদমতলীর রাজাবাড়ী এলাকায় ওয়াসিম আহমেদ নামে এক জনকে অপহরণের অভিযোগে তার স্ত্রী থানায় মামলা করেন।
এছাড়া, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে মো. মকবুল নামে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে ৬০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অপরাধ বাড়ায় বাড়ছে জনমনে শঙ্কা
২০২১ সালে যেখানে সারা দেশে অপহরণের ঘটনা ছিল ৪৪৫টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ১০২টিতে পৌঁছেছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় সতর্কসংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘটনাটি ৮০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় বছর শেষে সংখ্যাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপহরণ প্রতিরোধে শুধু মামলা ও গ্রেফতার নয়, অপহরণকারী চক্র শনাক্ত, মুক্তিপণ লেনদেনের অর্থের উত্স ও ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর নজরদারি, নিখোঁজ ব্যক্তির ঘটনায় দ্রুত সমন্বিত অভিযান এবং শিশুদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপহরণের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধও বাড়বে।