ক্রিকেট যার ধ্যানজ্ঞান, এক হার না মানা তরুণের গল্প

একসময় নিজেই ছিলেন ক্রিকেটার। খেলেছেন ঢাকা বিভাগের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে শেখ জামাল ও কলাবাগানের মতো ক্লাবেও। স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে খেলার। কিন্তু ইনজুরি থামিয়ে দেয় সেই পথচলা। ব্যাট-প্যাড তুলে রাখতে বাধ্য হন সাদ্দাম হোসেন মিঠু। ক্রিকেটের প্রতি তার যে অগাদ ভালোবাসা, সেই ভালোবাসা থেকে নিজেই খুলেছেন ক্রিকেট একাডেমি।

নিজ জন্মভূমি চাঁদপুরের শাহরাস্তি থেকে জাতীয় মানের ক্রিকেটার তৈরি করতে গড়ে তুলেছেন ‘শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমি’। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করলেও ২০১৮ সাল থেকেই একাডেমি নিয়ে কাজ করছেন সাদ্দাম। বর্তমানে সেখানে নিয়মিত অনুশীলন করেন ৪০ জন ক্রিকেটার। জেলার প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে একাডেমির চার ক্রিকেটার চলতি মৌসুমে ঢাকা তৃতীয় বিভাগ কোয়ালিফাইং ক্রিকেট লিগে খেলছেন। তারা চাঁদপুর জেলার মূল দলেও নিয়মিত খেলছেন।

নিজের ক্রিকেটজীবনের গল্প বলতে গিয়ে সাদ্দাম বলেন, ‘আমি প্রথম বিভাগের ক্রিকেটার ছিলাম। সাত-আট বছর ঢাকা লিগে নিয়মিত খেলেছি। ২০২২ সালে ঢাকা লিগে খেলার সময় অনুশীলনে বল লেগে আমার নাভি ফেটে যায়। এ কারণে এক বছর ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলাম। তখনই মাথায় আসে, শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমিকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাব। আমার স্বপ্ন ছিল জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেটার হওয়া। আমি হতে পারিনি। তাই আমার লক্ষ্য, তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় মানের ক্রিকেটার বের করা। সেই উদ্দেশ্যেই একাডেমি করেছি।’
ক্রিকেটার তৈরির পাশাপাশি ক্রিকেটের জন্য অবকাঠামো তৈরিতেও কাজ করছেন সাদ্দাম। নিজের অর্থায়নে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করে সূচিপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের একটি পুকুর ভরাট করে খেলার মাঠ তৈরি করেছেন। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে চালু করেছেন টেপ টেনিস ক্রিকেট টুর্নামেন্ট—শাহরাস্তি প্রিমিয়ার লিগ (এসপিএল)। ইতোমধ্যে তিনটি আসর মাঠে গড়িয়েছে। দেশের সেরা টেপ টেনিস ক্রিকেটারদের পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকেও ক্রিকেটাররা এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। ফলে সাদ্দামের এই আয়োজন নিয়ে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আলাদা আগ্রহ।

এসপিএলের প্রথম আসরে প্রায় ১৩ লাখ, দ্বিতীয় আসরে ৩২ লাখ এবং তৃতীয় আসরে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ডিসেম্বরে মাঠে গড়ানোর কথা রয়েছে লিগের চতুর্থ আসর। এবারের আসরের বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এত বড় আয়োজনের অর্থের উৎস সম্পর্কে সাদ্দাম বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছ থেকে কোনো অর্থ নিই না। যারা আমার কর্মকাণ্ডকে ভালোবাসেন, ক্রিকেটকে ভালোবাসেন, তারা আমাকে স্পন্সর করেন। সবশেষ আসরেও টুর্নামেন্ট করতে গিয়ে আট লাখ টাকা লস করেছি। টুর্নামেন্টে কতটা আয়-ব্যয় হচ্ছে, আমার কাছে সবকিছুর হিসাব আছে। কেউ চাইলে তদন্ত করে দেখতে পারেন। আমি আমার তরফ থেকে শতভাগ স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করি।’

শাহরাস্তিকে ক্রিকেটের মাধ্যমে সারা দেশে পরিচিত করার লক্ষ্যেই এসপিএলের আয়োজন বলে জানান সাদ্দাম। বলেন, ‘আমি আমাদের শাহরাস্তি উপজেলাকে ক্রিকেট দিয়ে পুরো বাংলাদেশে রোল মডেল করতে চাই। সেই ধারণা থেকেই লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছি।’ এসপিএলের মাঠে বসে খেলা উপভোগ করেছেন জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান একাধিক ক্রিকেটার। তাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফুল, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ও শামীম পাটোয়ারীসহ আরও অনেক ক্রিকেটার। টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন জাতীয় দলের অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরুল কায়েস। চতুর্থ আসরকে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা সাদ্দামের। চতুর্থ আসর নিয়ে বলেন, ‘এবারের আসর আগের চেয়ে আরও জমকালোভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছি। এলইডি স্ক্রিন থেকে শুরু করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন—সবকিছুতেই নতুনত্ব থাকবে। এবারের আসরে প্রথম পুরস্কার হিসেবে গাড়ি দেওয়া হবে। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বাজেট।’

এত বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। সাদ্দাম বলেন, ‘এলাকাবাসী আমাকে অনেক সহযোগিতা করেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মমিনুল হক—দলমত নির্বিশেষে সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন। আমি তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। তারা সবাই আমার সব কৃতিত্বের অংশীদার।’

ক্রিকেটার তৈরির পাশাপাশি ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও কাজ করছেন সাদ্দাম। চাঁদপুর জেলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের চাঁদপুর জেলা ক্রিকেট দলের ম্যানেজার ও শাহরাস্তি দলের হেড কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন। সেই টুর্নামেন্টে জেলা পর্যায়ে শাহরাস্তি ফাইনাল খেলেছে। পাশাপাশি শাহরাস্তি ক্রীড়া সংস্থার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হেড কোচ হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। নতুন কুঁড়ির মূল পর্বে চাঁদপুরের তিন ক্রিকেটারের মধ্যে দুজনই শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমির। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে শাহরাস্তিতে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনেও সহযোগিতা করেন সাদ্দাম। নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ট্রফি ও জার্সি দিয়ে উৎসাহিত করেন তরুণদের। উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটারকে আরো উন্নত করা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটে অবদান রাখা। ভবিৎতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ ফেলে নিজের সর্বোাচ্চটা দিয়ে কাজ করতে চান সাদ্দাম।