সমাজ, সংসার ও পারিবারিক টানাপোড়েনের গল্প

রাত ভ’রে বৃষ্টি

গত বছরের একটি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বিবাহের তুলনায় বিচ্ছেদের সংখ্যা অনেক বেশি। শুধু গত বছরেই প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদের নেপথ্যে আসলে কী কী কারণ আছে, সেগুলো কি আদৌ আমলে নেওয়া হয় কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ আছে। তবে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসুর ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত উপন্যাস ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে যা অশ্লীল ও সমাজবিরোধী আখ্যায় আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল। এমনকি পাণ্ডুলিপি পর্যন্ত ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯-৭৩ সাল পর্যন্ত মামলা চালিয়ে উচ্চ আদালতে গিয়ে খারিজ হয় অভিযোগ। আসলে কোনো কালেই মানুষ প্রচলিত ধারণার বাইরে আসতে পারেনি বা প্রচলিত ধারণার বাইরের কোনো কিছু সহজে মেনে নিতে পারেনি। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসের এই গল্প ভাবনাও তেমনি। প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজকে দেখা। একটি পরিবারের ভেতরের দুঃখ-সুখের গল্প বলা। সেই দুঃখ-সুখ শুধু বৈষয়িক নয়, ইন্দ্রিয়গত। বিয়ে ও সংসার নামক জটিল সমীকরণের ভেতরে থেকে তাকে সহজে মেনে নেওয়া। বিয়ে মানেই যে শুধু একটি নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে সন্ধি আর সারাটি জীবন ধরে তার সঙ্গেই সকল কিছুর বিনিময়, এ ধারণা এখন সারা বিশ্বই পাল্টে নিচ্ছে। সাংসারিক জীবনে পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা যেমন থাকে, তেমনি একজন নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে একত্রে থাকার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা কখনো কখনো বদলে যায়, কেননা মানুষের ভালোলাগা ও ভালোবাসা প্রতিমুহূর্তে বদলে যায়।

বাংলাদেশের মঞ্চে নতুন আবির্ভূত নাট্যদল আপস্টেজ তাদের নতুন নাটক হিসেবে মঞ্চে এনেছে সমাজ সংসার ও পারিবারিক টানাপোড়েনের গল্প ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’। উপন্যাসের মঞ্চরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন আপস্টেজের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক সাইফ সুমন। নির্দেশনার ক্ষেত্রে আলাদা করে বেশি কিছু দেখানোর চেষ্টা করেননি, বরং চেষ্টা করেছেনে অভিনয়কে মুখ্য করে তুলে ধরতে। সেক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেনও বটে। অবশ্য নাটকে যে তিনজন অভিনয় করেছেন, তারা প্রত্যেকেই অভিজ্ঞ। নিজেদের নাট্যদলে তারা সে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এরমধ্যে। তবে মনিমালা চরিত্রে বটতলার কাজী রোকসানা রুমা অনেকটাই অনবদ্য। যদিও ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় শুরুর প্রায় দশ মিনিট তাকে এবং অংশু চরিত্রে প্রশান্ত হালদারকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল। সেটার কারণ অবশ্য নাটক দেরিতে শুরু হওয়া হতেই পারে। পরে তারা তাদের প্রাঞ্জলতা ফিরে পান। দারুণ এক মোহময়তা তৈরি করেন দর্শকের মধ্যে। নীরবে তাদের অভিনয়ে মুগ্ধ হতে থাকেন এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলের দর্শক। অংশুর সঙ্গে দাম্পত্যজীবন বেশ ভালোই কাটছিল মনিমালার কিন্তু তাদের সংসারে উল্কার মতো এসে সবকিছু বদলে দেয় জয়। অংশুর কাছ থেকে যে সুখ বা ভালোলাগা পায়নি, সেগুলো মনিমালা পেতে চেষ্টা করে জয়ের মধ্যে। ধীরে ধীরে দুজনের কাছা আসা এবং এক পর্যায়ে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি ধরে ফেলে অংশু। সংসারের গতিপথ বদলে যেতে থাকে ভিন্ন দিকে। জয় চরিত্রে রঞ্জন দে সাথীকে কিছুটা বেখেয়ালী মনে হলো সেদিন। মনে হচ্ছিল জোর করে অভিনয় করে যাচ্ছেন তিনি। হয়তো আগে এমনটা হয়নি, আবার পরের কোনো শোতেও এমনটা হবে না। সকলেই বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। আর মনিমালা যদি জয়ের সঙ্গে বা অংশুর সঙ্গে কোনো জড়তা ছাড়া আরো একটু ইন্টিমেট হতে পারেন, তবে দর্শক মনে গ্রহণযোগ্যতা বেশি পাবে বলেই মনে হয়। মনিমালা তো দুজনকেই ভালোবাসে—দুজনকেই তো কাছে টানে!

নির্দেশককে সংগীত, আলো, পোশাকে যারা সহযোগিতা করেছেন, তারা প্রত্যেকেই বেশ ভেবেছেন বলেই মনে হলো। এর মধ্যে অম্লান বিশ্বাসের আলোক পরিকল্পনা এবং রুনা কাঞ্চনের পোশাক পরিকল্পনা চমত্কার হয়েছে। তবে জয়ের পোশাক ও মনিমালার নাইট ড্রেস নিয়ে আরেকটু ভাবা যেতে পারে। বিশেষ করে জয়ের আধুনিক কালের টাইট ফিটিং শার্ট খুব একটা মানানসই মনে হয়নি। শাকিল সিদ্ধার্থ মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন দারুণ। সব মিলিয়ে অভিনেতাদের প্রাণবন্ত অভিনয় এবং নাট্যগল্প দর্শকের জন্য ভালোলাগার হবে নিশ্চিত।