বিন্নার ফুলে ঝাড়ু, তাতেই সংসারে কিছুটা স্বস্তি

শরতের বিদায়লগ্নে চলনবিল এলাকার রায়গঞ্জ ও তাড়াশের বিস্তীর্ণ পথপ্রান্তজুড়ে ফুটেছে শুভ্র বিন্না ফুল। মেঠোপথের দুপাশে বাতাসে দোল খাওয়া সেই বিন্না ঘাসের ফুল পরম যত্নে সংগ্রহ করছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একদল নারী। বছরের এই সময়ে মাঠে কৃষিকাজের সুযোগ কম থাকায় সংসারের অভাব মেটাতে বিন্না ঘাসের ফুল দিয়ে ঝাড়ু তৈরি করছেন তারা। পরে স্থানীয় হাট-বাজারে এসব ঝাড়ু বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন তারা।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বাসাইল ও পশ্চিম আটঘোরিয়া এলাকার জেসনা রানী মাহাতো, কুসুম রানী মাহাতো ও চন্দনা রানী ওঁরাও জানান, সংসারের খরচ চালাতে বছরের এই সময়টাতে বিন্নার ফুল সংগ্রহ করে ঝাড়ু তৈরি করেন তারা। এতে একদিকে যেমন বাড়তি আয় হচ্ছে, অন্যদিকে সংসারের প্রয়োজনীয় ঝাড়ুও কিনতে হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহাজনি ঋণের জালে বন্দি জীবন ও আগাম শ্রম বিক্রি করে দিন কাটে এসব পরিবারের। শরৎ ও হেমন্তের এই সময়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়। ধান রোপণ, পাকা ধান কাটার মৌসুম কিংবা ইটভাটায় কাঁচা ইট তৈরির কাজ—সবই এ সময়ে বন্ধ থাকে। ফলে তীব্র অর্থসংকটে পড়েন শ্রমজীবী মানুষ। জীবনধারণের তাগিদে অনেকে আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় ওঁরাও, মাহাতো, রাজবংশী, রবিদাস, কনকদাস, মুরারী, বসাইক ও সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। কালের পরিক্রমায় এসব সম্প্রদায়ের মানুষের ঐতিহ্য ও জীবিকায় পরিবর্তন এসেছে।

একসময় এসব সম্প্রদায়ের অনেকে বনাঞ্চলে শিয়াল, খরগোশ, কুঁইচা, বেজি ও কচ্ছপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় সেই ঐতিহ্যবাহী জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে-ঘাটে, গৃহস্থের বাড়িতে কিংবা ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ শুরু করেন।

তাড়াশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী মিনতি রানী ওঁরাও বলেন, ‘আশ্বিন ও কার্তিক মাসে আমাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। তাই অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মাঠে বোরো ধান লাগানো কিংবা ধান কাটার কাজের জন্য এখন থেকেই অনেকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছি। পরিবার বাঁচানোর তাগিদে দিনে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘তবে গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে বিন্না ঘাসের ফুল দিয়ে ঝাড়ু বানিয়ে বাজারে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে পারি। এতে চরম মন্দার এই সময়েও সংসারে বাড়তি কিছুটা আয় হয়।’

সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি নির্মল মাহাতো বলেন, জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবার চালাতে নারী-পুরুষ উভয়কেই মাঠে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে কাজ না থাকায় শ্রমজীবী পরিবারগুলো সংসার চালাতে হিমশিম খায়।

তিনি বলেন, কম দামে আগাম শ্রম বিক্রির পাশাপাশি বিন্নার ফুল কুড়িয়ে ঝাড়ু তৈরি করে যেকোনোভাবে জীবিকা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। প্রতিদিন একজন নারী ২০০ থেকে ২৫০ টাকার ঝাড়ু বিক্রি করেন।