মৃত্যুর আগে তাজমিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল, চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলল সিসিটিভি ফুটেজে

রাত ১১টা ৪০ মিনিট। বুধবার (৭ অক্টোবর) কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে নেমে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে আসে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন। পরনে গোলাপি কামিজ ও জিন্স প্যান্ট। হাতে মুঠোফোন, বাঁ হাতে ঝোলানো ভ্যানিটি ব্যাগ।

সেখানে একটি কনফেকশনারির দোকানির সঙ্গে কথা বলে সে। একপর্যায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যায়। মৃত্যুর আগে হোটেল নুরজাহানের সামনে জান্নাতুল তাজমিনের সর্বশেষ অবস্থানের এ চিত্রটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়।

নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং জব্দ করা মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে সামান্য দূরে পড়ে থাকা ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক- এসব বিষয় তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।

এদিকে জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলে মিলেছে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন।

এদিকে গতকাল ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে স্কুলছাত্রী তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে এলোমেলো হয়ে আছে ধানগাছ। পাশে পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। স্থানীয়দের ধারণা, প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল তাজমিন। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত করছে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানায়, নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকার আবদুল আলীমের মেয়ে। তারা কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকত। সেই বাসা থেকে গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে যায় তাজমিন। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করা হলো তার মরদেহ। ১৫ বছর বয়সী তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন। রাতে পদুয়ার বাজারে পৌঁছে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে সে। সিসিটিভি ফুটেজে ওই এলাকায় তার অবস্থান ও দোকানির সঙ্গে কথা বলার দৃশ্য দেখা গেলেও সেখান থেকে চলে যাওয়ার পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বুধবার গভীর রাতে মেয়ের কাছ থেকে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান তিনি। মেয়েটি তাকে সেখানে গিয়ে নিয়ে আসতে বলেছিল। তবে তখন ঘুমিয়ে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে বার্তাটি দেখতে পারেননি। পরে লোকেশন দেখে সেখানে গিয়ে তাজমিনের নিথর মরদেহ দেখতে পান।

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, সকালে আশপাশের মানুষের কাছে শুনতে পান ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে আছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বিষয়টি দেখতে পান। সিএনজিটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের ধানক্ষেতগুলোতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্নও দেখতে পান তিনি। সেই চিহ্ন অনুসরণ করে সামনে একটি ধানক্ষেতে গিয়ে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।

লাশের মাথা কাদায় গাড়ানো ছিল জানিয়ে রুহুল আমিন বলেন, পুরো শরীর বস্ত্রহীন ছিল। গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে দলে দলে মানুষ মরদেহ দেখতে আসতে থাকলে তিনি একটি গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে দেন। এ সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে তার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। তার দাবি, ঘটনার তদন্ত হয়ে দোষীদের শাস্তি হোক, সেটাই চাই।

লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহটি অজ্ঞাত ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে। নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে হত্যার বিবরণ জানা যাবে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজি চালিত অটোরিকশাটি রেজিস্ট্রেশনকৃত। আমরা সেটির সূত্র ধরে এগোচ্ছি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করছি। আশা করি, রহস্য উদ্ঘাটন হবে।

এদিকে নিহত তাজমিনের মরদেহ নিয়ে যশোরে গ্রামের বাড়ি পৌঁছেছেন তার স্বজনরা। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুমিল্লা থেকে যশোরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয় বলে জানানো হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।